ঘাটাল মহকুমায় শুরু হোক বন্যা নিয়ন্ত্রণের প্রকৃত  রাজনীতি

এবছরের ২৫ জুলাই। দিল্লিতে রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ। শপথে উপস্থিত মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিকে উৎসমুখে ক’দিনের ভারি বৃষ্টি। যথারীতি ডিভিসি’র (দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন) উদারতা। খুশিমতো জল ছাড়ার প্রতিযোগিতায় ডিভিসি–কংসাবতী। অতএব আবার বন্যা ঘাটালে। বন্যায় অভ্যস্থ শিলাবতীর পশ্চিমপাড়ও বুঝে উঠতে পারেনি কী হতে চলেছে। অথচ এরা গন্ধ শুঁকেই বলে দিতে পারে বন্যা আসছে। কারণ, বন্যারও একটা ‘গন্ধ’ আছে। কিন্তু এবার ঘ্রাণেন্দ্রিয় কাজ করেনি। তাই চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ থেকে পানীয় জল, মোবাইল চার্জ কিছুই ব্যবস্থা হয়নি। তার ওপর বন্যার জল দেখলেই আতঙ্কিত ইলেক্ট্রিক অফিস ১২টি ওয়ার্ডে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে। আর পৌরসভাও বন্ধ রাখে জল সরবরাহ। ব্যাস, ষোলকলা পূর্ণ। সময় না দিয়ে জল ঢুকেছে দোকানে, ঢুকেছে ঘর গৃহস্থলীতে। সব তোল, সব তোল। ওঠো আরও উপরে। শুধু জমির ফসল রইল জমিতেই। আসলে ঘাটালের সঙ্গে এই বন্যা রসিকতাটা চলছে স্বাধীনতার সত্তর বছর পরেও। তাই সবাই বলে, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া যায় এই বন্যা। অবশ্যই রেখে যাবে আমাদের উত্তর পুরুষের জন্যও।
কংগ্রেস নেতা ও স্বাধীনতা সংগ্রামী অতুল্য ঘোষ কুঠিবাজারে এক জনসভায় গভীর আক্ষেপে বলেছিলেন, ঘাটালে কোনও মানুষ নেই! এই তিরস্কার শুনে নির্লজ্জের মত হেসেছে এরা। আসলে আন্দোলন বিমুখ এই মানুষগুলো কোনও দিনও প্রতিবাদে মুখর হয়নি। পাথরের চোখ দিয়ে নির্বিকার তাকিয়ে থেকেছে বন্যার হলুদ জলের দিকে। এদিকে ব্যবসা শেষ, রুজি রোজগার বন্ধ। দোকান-বাজার-ঘর-বাড়ি ভেসে গিয়েছে। পড়াশোনার চরম ক্ষতি। ক্ষেতের ফসল নষ্ট। কিন্তু বুক ফাটলেও মুখ ফোটেনি এদের। যেন নির্বিকল্প ভাব সমাধিতে মগ্ন থেকে চরম সহ্যের পরীক্ষায় বসেছে।


মেদিনীপুর জেলা বন্যা-ভাঙন-খরা প্রতিরোধ কমিটির গুটি কয়েক লোকজন নিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণের একটা ধারাবাহিক আন্দোলন চললেও তাতে শহরের মানুষকে দেখা যায় না। উল্টে কয়েক বছর আগে, এই প্রতিবেদককে মহকুমা শাসকের সাক্ষাতে শুনতে হয়েছে, ‘ঘাটালের মানুষ বন্যা ভালোবাসে, তারা বন্যা চায়’। দুঃখের বিষয়, ৩৪ বছর ধরে সিপিএম বন্যাকে নিয়ে রাজনীতি করেছে। কিন্তু বন্যা নিয়ন্ত্রণে কোনও উদ্যোগ নেয়নি। আজ পর্যন্ত কোন ভোটে বন্যা ইস্যু হয়নি? আসলে মানুষ এই জল-যন্ত্রণাকে তাদের ভবিতব্য বলে মেনে নিয়েছে। তাই ত্রাণ ছাড়া অন্য কার্যকরী বিকল্প আমরা দেখিনি। আমাদের ভূমিকা ওই চা দোকানের আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ রেখেছি। জোরালো আওয়াজ তুলিনি কখনও। শুরু করিনি বন্যা নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি।দেখা যায় না।

কংগ্রেস নেতা ও স্বাধীনতা সংগ্রামী অতুল্য ঘোষ কুঠিবাজারে এক জনসভায় গভীর আক্ষেপে বলেছিলেন, ঘাটালে কোনও মানুষ নেই! এই তিরস্কার শুনে নির্লজ্জের মত হেসেছে এরা। আসলে আন্দোলন বিমুখ এই মানুষগুলো কোনও দিনও প্রতিবাদে মুখর হয়নি। পাথরের চোখ দিয়ে নির্বিকার তাকিয়ে থেকেছে বন্যার হলুদ জলের দিকে।
উল্টে কয়েক বছর আগে, এই প্রতিবেদককে মহকুমা শাসকের সাক্ষাতে শুনতে হয়েছে, ‘ঘাটালের মানুষ বন্যা ভালোবাসে, তারা বন্যা চায়’। দুঃখের বিষয়, ৩৪ বছর ধরে সিপিএম বন্যাকে নিয়ে রাজনীতি করেছে। কিন্তু বন্যা নিয়ন্ত্রণে কোনও উদ্যোগ নেয়নি। আজ পর্যন্ত কোন ভোটে বন্যা ইস্যু হয়নি? আসলে মানুষ এই জল-যন্ত্রণাকে তাদের ভবিতব্য বলে মেনে নিয়েছে। তাই ত্রাণ ছাড়া অন্য কার্যকরী বিকল্প আমরা দেখিনি। আমাদের ভূমিকা ওই চা দোকানের আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ রেখেছি। জোরালো আওয়াজ তুলিনি কখনও। শুরু করিনি বন্যা নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি। পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকলেও, ২৬ জুলাই সন্ধ্যায় প্রতাপপুরের চৌধুরি পাড়াতে বাঁধ ভাঙতেই শিলাবতীর পূর্ব পাড়ের অহংকারী হাসি মিলিয়ে যেতে দেরি  হয়নি। শ্যালিকাকে নিয়ে সেলফি তুলতে পশ্চিম পাড়ে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করে, ঘর-দোকান সামলাতে আর প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত হতে হয়েছে। প্রশাসন ঘন্টায় ঘন্টায় পূর্ব পাড়কে সতর্কবাণী শোনালেও, পশ্চিমপাড়ে এতোবড় বিপর্যয়েও এদের খঁুজে পাওয়া যায়নি। তবে কয়েকজন কাউন্সিলর ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কে বন্যার্ত মানুষের পাশে থেকেছে। মার্চ-এপ্রিল মাসেই রাজ্য প্রশাসন ত্রাণ সামগ্রী  পাঠিয়ে দিলেও, পরিস্থিতি বুঝতেই এদের সময় চলে গিয়েছে। বিপর্যয়ের মোকাবিলা করে উঠতে পারেনি। পারেনি গঠন করতে ভুক্তভোগী মানুষদের নিয়ে স্থায়ী ডিজাস্টার ম্যানেজম্যান্ট টিম। আর ‘বন্যা নিয়ন্ত্রণের’ কথা ঘাটালের মানুষ প্রায় ভুলেই গিয়েছে। এদিকে বিজ্ঞান দম্ভের সঙ্গে ঘোষণা করে, পৃথিবী নাকি আমাদের হাতের মুঠোয়। অথচ বন্যা হলেই দোষী করে প্রকৃতিকে।  এক সময় বর্ষা ঋতু চলে যায়। বন্যার জলও নেমে যায়। এসে যায় শারদীয় উৎসব। ভোলামন ভুলে যায় জল-যন্ত্রণা। ভুলে যায় প্রকৃতি আর ডিভিসির হাতের পুতুল হওয়ার দিনগুলি। বন্যার গন্ধ মিলিয়ে যায় শরতের বাতাসে। তাই আজও কার্যকর হয়নি বহু চর্চিত, বহু প্রতীক্ষিত ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার আশ্বাস দিলেও না। গঙ্গা ফ্লাড কন্ট্রোল কমিশন ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের টেকনিক্যাল ত্রুটি খুঁজে বেড়ায়, আর পিছিয়ে যায় কাজ। বেড়ে যায় ব্যায়ভার। পাশাপাশি অর্থ বরাদ্দে কেন্দ্রের দীর্ঘ টালবাহানাতো আছেই। তাই চিরকালই ঘাটাল হবে ব্রেকিং নিউজ।

 

 

অতনুকুমার মাহিন্দার

•লেখক পরিচিতি:অতনুকুমার মাহিন্দার পেশায় ব্যবসায়ী হলেও ঘাটাল শহরে প্রবন্ধকার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে সুনাম অর্জন করেছেন। মো:৭৮৭২৪৩৯৪৪৯

Recommend to friends
  • gplus
  • pinterest

About the Author

তৃপ্তি পাল কর্মকার

সম্পাদক, ‘স্থানীয় সংবাদ’ • মতামত ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য মেল করতে পারেন।
  • gplus

Leave a comment