পথ দুর্ঘটনা: আমরাও সমান দায়ী

 

পথ দুর্ঘটনা: আমরাও সমান দায়ী

‘সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফ’ কে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মুর্শিদাবাদের ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনা এটাই প্রমাণ করে দিল, বিজ্ঞাপন আর বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে ফারাক বিস্তর। শুধু নিয়ম করলেই হয় না, নিয়ম পালন করতে হয়। নিয়ম ভঙ্গে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। খাতা কলম আর গাড়ির পা-দানিতে নিয়ম আবদ্ধ থাকলে এই রকম দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি বারংবার ঘটতে থাকবে।
যাই হোক, যেকোনও দুর্ঘটনা ঘটলে আমাদের যেটা প্রথম প্রচেষ্টা থাকে সেটা হল, দোষটা কারও ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া। এই মুহূর্তে আপাতত টার্গেট মৃত বাস ড্রাইভার এবং তার মোবাইল ফোন! অবশ্য ড্রাইভার ‘মরিয়া বাঁচিয়াছে’!
কিন্তু শুধু কি ড্রাইভারের অসাবধানতার জন্যই এই দুর্ঘটনা? আমার আপনার কি একটুকু দোষও নেই?
প্রতিদিন বাড়ি থেকে স্কুল যাওয়ার পথে ৩০ কিলোমিটার বাস জার্নি করতে গিয়ে দেখেছি, দুর্ঘটনা শুধু ড্রাইভারের দোষে হয় না! আমাদের আপাত নির্বিকার মনোভাব এবং সমস্ত অন্যায় দেখেও মুখ বুঝে সহ্য করার মানসিকতাও সমান দায়ী।
প্রথমত, যদি বাসের অবস্থার কথা ভাবি তাহলে বলতে হয় প্রতিদিন সড়কে এমন কিছু যাত্রীবাহী বাস চলাচল করতে দেখা যায় যেগুলোর সত্যিই পারমিট কেড়ে নেওয়ার সময় পেরিয়ে গিয়েছে। নিতান্তই ঝরঝরে, বৃষ্টির জল ছাদ ভেদ করে যাত্রীর মাথায় এসে পড়ে, প্রখর গ্রীষ্মের প্রচণ্ড রোদ ঢাকার জন্য জানালায় কাঁচ নেই, অধিকাংশ সিটে শুধুমাত্র লোহার কাঠামোর ওপর প্লাস্টিকের কভার। তাপ্পি মারা চাকায় গ্রিপ নেই বললেই চলে। ইঞ্জিন থেকে নির্গত ক্রমাগত কালো ধোঁয়া আর প্রতিনিয়ত পিছন থেকে ঠেলে স্টার্ট করা ইঞ্জিনের বাসগুলি কিন্তু রমরমিয়ে চলছে! যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্যের কথা দূরে থাক, সুরক্ষার ন্যূনতম ব্যবস্থাটুকুও নেই। প্রায় সব বাসেই এমার্জেন্সি গেট সিল করে সেই স্থানে আরও দুজনের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে! কোনওভাবে দুর্ঘটনা ঘটলে সেই গেট কখনই খুলতে পারবেন না যাত্রীরা। অথচ এই সমস্ত বাসগুলি প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে রমরমিয়ে ‘ব্যাবসা’ করে চলেছে, সকলেই নির্বিকার। নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে সেই বাসেই ওঠার জন্য আমি-আপনি প্রতিযোগিতা করি।
একটা বাসে বসার আসনের সংখ্যা যদি কমবেশি ৫০ টি হয়, সেই বাসে অন্তত ৯০ জন চাপানো হয়। একটা বাসের ধারণ ক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ যাত্রী যখন থাকে তখন ড্রাইভারের ক্ষেত্রে ভারসাম্য ঠিক রাখা সত্যিই অসম্ভব! যদিও দৈনন্দিন দক্ষতায় এভাবেই তারা বাস নিয়ে চলেছেন। শুধু কী বাসের ভেতরে? খোলা ছাদে অন্তত আরও ৩০ জন প্যাসেঞ্জার এবং ছাদে ওঠার সিঁড়ি বা পা-দানিতে আরও ১০ জন! একটু এদিক ওদিক হলেই মৃত্যুর হাতছানি! রাস্তার ওপর ভাসমান হাইভোল্টের ইলেকট্রিক তার অথবা গাছের ডালপালা যেকোনও মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। রাস্তার ওপর থাকা খানাখন্দে চাকা পড়লে, সেই প্রবল ঝাঁকুনিতে ছিটকে পড়ার সম্ভবনাও প্রবল। তবু এসমস্ত কিছু উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষ জীবন বাজি রেখে জীবিকার লক্ষ্যে প্রাণপাত করে চলেছেন।
রাস্তার অবস্থাও সেই রকম, যেকোনও সময় দুর্ঘটনা ঘটানোর জন্য সর্বদা প্রস্তুত। বর্ষাকালে কিছু কিছু রাস্তার ওপর হাঁটু পর্যন্ত জল জমা থাকে! এছাড়াও সারা বছর জুড়ে ভাঙা চোরা রাস্তা বাস বা যেকোনও গাড়ি চলাচলের উপযোগী থাকে না। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে নতুন রাস্তা তৈরির কয়েকমাসের মধ্যেই ভেঙে চুরমার। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঠিকাদার, যিনি রাস্তাটি তৈরি করেছেন তিনি নির্দিষ্ট মালমশলা সঠিক অনুপাতে মিশিয়ে বিজ্ঞানসম্মত ভাবে রাস্তা তৈরি করবেন — এটা ভাবা নেহাত বিলাসিতা। বরাদ্দ অর্থের ভাগ বাঁটোয়ারা শেষে অভাগা রাস্তার কপালে যেটুকু জোটে তাতে তার আয়ু যে মাত্র কয়েক মাসেরই হবে, সেটা এতদিনে সকলেই বুঝে গেছেন।
শুধু তাই নয়, ১০ টন মাল বহনের উপযুক্ত রাস্তায় নির্বিবাদে বিশ পঁচিশ টন মাল বহনকারী ভারি গাড়ি তীব্র গতিতে ধেয়ে চলে। প্রশাসনের যে এদিকে একদমই নজর নেই তা ঠিক নয়, তবে রাস্তার মাঝে কিছু দেওয়া-নেওয়ার ফাঁকে আইনের বুড়ো আঙুল দেখা ছাড়া উপায় নেই।
ঘটা করে প্রতিটি পেট্রল পাম্পে নোটিশ ঝোলানো হল, ‘হেলমেটহীন বাইক আরোহীদের পেট্রল বিক্রি বন্ধ’। অথচ কলকাতার বাইরে এই আইন কার্যত অকেজো। বেশিরভাগ বাইক আরোহী নিয়মের তোয়াক্কা না করে, ট্রাফিক পুলিসের নাকের ডগায় বিনা হেলমেটে তীব্র গতিতে ধেয়ে চলেছে। পাম্প কর্তৃপক্ষও নির্দ্বিধায় পেট্রল বিক্রি করে চলেছেন, সিসিটিভির নজরদারির মধ্যেও। সমানুপাতিক হারে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনাও ঘটে চলেছে! দুর্ঘটনা পরবর্তী কিছু সময়ের জন্য প্রশাসনের নজরদারি দেখা গেলেও, মুলত প্রশাসন শীতঘুমে। আর সবকিছু দেখেও আমরা বারে বারে মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করতে ছুটে চলেছি, ঠিক যেন হ্যামলিনের বাঁশি বাদকের পিছনে সম্মোহিত ইঁদুরের দল।

Recommend to friends
  • gplus
  • pinterest

About the Author

Soumen Misra

তথ্যভিত্তিক সত্য, কথায় ও লেখায় প্রকাশ পাক।
✆+919932953367
Em@il:- soumenmisra.in@gmail.com
  • gplus

Leave a comment