কেয়া মণ্ডল চৌধুরী, ‘স্থানীয় সংবাদ’, ঘাটাল: আজকের বেলতলা প্রাণবন্ত, ব্যস্ত আর মানুষের কোলাহলে মুখর। দোকানপাট, যানবাহন, মানুষের ভিড় ,সব মিলিয়ে আজ এটি এক চেনা জনপদ। কিন্তু ১৯৭০ সালের ঘাটাল-মেচোগ্রাম রাস্তার পাশে দাসপুর থানার বেলতলা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ছবি। চারদিকে ঘন জঙ্গল, সরু পাকা রাস্তা, হাতে গোনা কয়েকটি ঘর আর হ্যারিকেনের আলোয় জ্বলা ছোট চা–দোকান ,এমনই ছিল সেই সময়ের বেলতলা। সন্ধ্যা নামলেই চারপাশে নেমে আসত নিস্তব্ধতা। এখানে বাসও দাঁড়াত না, মানুষের আনাগোনাও ছিল খুব কম। তবুও সেই নির্জনতার মাঝেই জন্ম নিয়েছিল এক বড় স্বপ্ন বেলতলাকে জাগিয়ে তোলার স্বপ্ন, মানুষে মানুষে মিলনের স্বপ্ন।
এই স্বপ্ন দেখেছিলেন হরিপদ সামন্ত, ব্রজেন মাইতি, খগেন মন্ডল, নবীরুদ্দিন শেখ, মইনুদ্দিন শেখ আলি, অনিল বন্দ্যোপাধ্যায়, হারুন অল রশিদ প্রমুখ মতো এলাকার কয়েকজন দূরদর্শী ব্যবসায়ী। তাঁরা বুঝেছিলেন, বেলতলাকে জমজমাট করে তুলতে হলে দরকার এমন এক উদ্যোগ, যা মানুষকে একসাথে টানবে। সেই ভাবনা থেকেই শিবরাত্রির পবিত্র তিথিকে কেন্দ্র করে শুরু হয় বেলতলা সর্বজনীন শিবদুর্গা পুজো ও মেলা। উদ্দেশ্য ছিল বেলতলায় মানুষের আনাগোনা বাড়ানো, ব্যবসা–বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করা এবং ওখানে বাসস্টপ চালু করানো।
এই উৎসবের সূচনা ছিল সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রথম শিবদুর্গার প্রতিমা তৈরি হয়েছিল মইনুউদ্দিন সাহেবের নিজের বাড়িতে। মিত্তিরদের খালি জমিতে বসে সেই ছোট্ট মেলা। আয়োজন ছিল সীমিত, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের মিলন ছিল অপরিসীম। হিন্দু–মুসলিম নির্বিশেষে সবাই একসাথে এই উৎসব গড়ে তুলেছিলেন। সেই থেকেই নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রতি বছর দশ দিন ধরে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
সময়ের সাথে সাথে ছোট্ট সেই আয়োজন আজ এক বিশাল উৎসবে পরিণত হয়েছে। ৫৬ বছরের এই পথচলায় বেলতলার শিবদুর্গা পুজো ও মেলা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং মানুষের মিলনের এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছে। এখানে জাতি–ধর্ম, ধনি–গরিব, ছোট–বড় সব ভেদাভেদ ভুলে মানুষ একসাথে আনন্দ উপভোগ করে। এই মেলা মানুষকে শিখিয়েছে,ঐক্য আর ভালোবাসাই আসল শক্তি।
এই মেলা শুধু পুজো বা আচার–অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি বেলতলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু। মেলার দিনগুলোতে চারদিক ভরে ওঠে গানের সুর, হাসির শব্দ আর মানুষের পদচারণায়। ছোট ছোট দোকান, খেলনা, মাটির জিনিস, মিষ্টির ঘ্রাণ—সব মিলিয়ে যেন এক অন্যরকম পৃথিবী তৈরি হয়। এখানকার মঞ্চে উঠে এসেছে বহু গানের শিল্পী, মৃৎশিল্পী ও নানা প্রতিভাবান মানুষ। অনেকের জীবনে এই মেলা নতুন পরিচয় এনে দিয়েছে, স্বপ্ন দেখার সাহস জুগিয়েছে। বর্তমান সভাপতি অরুময় ঘোষ বলেন, জন্মলগ্ন থেকেই এই মেলা ধর্মীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে ভ্রাতৃত্ব ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা বহন করে আসছে। সম্পাদক সৈয়দ সাব্বির আহমেদ দৃঢ় কণ্ঠে জানান, যত বিপদ -বাধাই আসুক, এই উৎসব কোনোদিন থামবে না কারণ এটি মানুষের হৃদয়ের অঙ্গীকার।
৫৬ বছরের এই পথচলা আজ শুধু একটি ইতিহাস নয়, এটি অসংখ্য মানুষের স্মৃতি, ভালোবাসা আর আবেগের সঞ্চয়। এই মেলার মাটিতে কারও শৈশবের হাসি লুকিয়ে আছে, কারও প্রথম গান গাওয়ার স্মৃতি, কারও বন্ধুত্বের গল্প, কারও প্রার্থনার নীরব অশ্রু। অনেকেই বছরের পর বছর এই মেলার জন্য অপেক্ষা করে থাকে ,কারণ এই কয়েকটি দিন যেন তাদের জীবনে নতুন করে আনন্দের আলো জ্বালায়। এখানে দেবতার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ শুধু পুজো দেয় না, একে অপরের হাতও শক্ত করে ধরে। এখানে ধর্ম নয়, মানুষই সবচেয়ে বড় পরিচয়। একসাথে খাওয়া, একসাথে ঘোরা, একসাথে হাসি এই মেলাই মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, ভেদাভেদ নয়, ভালোবাসাই আসল শক্তি। বেলতলার এই শিবদুর্গা পুজো ও মেলা তাই শুধু একটি উৎসব নয়, এটি মানুষের মিলনের সেতু, সম্প্রীতির প্রদীপ, আর একসাথে বেঁচে থাকার প্রতিশ্রুতি। যতদিন এই মেলার আলো জ্বলবে, ততদিন বেলতলার আকাশে ভেসে থাকবে ঐক্যের সেই অমলিন বার্তা—আমরা আলাদা নই, আমরা সবাই এক—এই উৎসব সবার, এই আনন্দ সবার।








