এই মুহূর্তে ক্রীড়া/অনুষ্ঠান অন্যান্য সাহিত্য সম্পাদকীয় নোটিশবোর্ড

E-Paper

ঘাটাল শহরে উচ্ছেদের নামে প্রশাসনের এই নাটক করার কি আদৌ প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয়?

Published on: September 2, 2026 । 8:45 PM

তৃপ্তি পাল কর্মকার, ‘স্থানীয় সংবাদ’, ঘাটাল:  ঘাটালে জবরদখল উচ্ছেদ অভিযানের কয়েক দিনের মধ্যেই ফের পুরনো ছবি ফিরে আসতে শুরু করেছে। ঘাটাল শহরের মধ্যে  ঘাটাল-মেচোগ্রাম সড়কের দু’পাশের সার্ভিস রোড ফের বেদখল হতে শুরু করায় শহরবাসীর মনে ক্ষোভ দানা বাঁধছে। আর এই চেনা দৃশ্য ফিরে আসতেই সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে শুরু করেছে, উচ্ছেদের নামে প্রশাসনের এই নাটকের আদৌ কী প্রয়োজন ছিল? যদি রাস্তা দখলমুক্ত রাখতেই না পারবে, তবে সাধারণ ব্যবসায়ীদের আর্থিকভাবে পঙ্গু করার কী যুক্তি থাকতে পারে? শাসকদলের জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়েও নাগরিক মহলে বিস্তর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
গত ১৭ জুলাই ঘাটাল শহরজুড়ে এক বিরাট উচ্ছেদ অভিযান চালায় প্রশাসন। দীর্ঘদিন ধরেই জবরদখল সরানোর বিষয়ে টালবাহানা চলছিল। প্রশাসন সূত্রে আগে থেকেই ঘোষণা করা হয়েছিল, ওই দিন সকাল থেকে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু হবে। সেইমতো নির্দিষ্ট সময়ে মহকুমা প্রশাসন, পূর্ত দপ্তর, পুলিশ ও দমকল বাহিনী বুলডোজার নিয়ে হাজিরও হয়েছিল। প্রস্তুত ছিলেন বুলডোজারের চালকও। কিন্তু অভিযান শুরুর আগেই তৈরি হয় চরম জটিলতা। পুলিশ ও প্রশাসনের আধিকারিকরা তড়িঘড়ি বৈঠকে বসেন। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলে সেই রুদ্ধদ্বার আলোচনা। কারণ হিসেবে জানা যায়, সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রীর মুখে শোনা গিয়েছিল, পুজোর আগে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া আপাতত বন্ধ থাকবে। সেই বক্তব্যকে মান্যতা দিয়ে ১৬ জুলাই পশ্চিম মেদিনীপুরের  পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা জানিয়েছিলেন, আপাতত পিচ রাস্তা থেকে দোকান একটু সরিয়ে দেওয়া হবে। প্রয়োজনে কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া হবে। মূলত পুলিশ সুপারের এই বার্তার সূত্র ধরেই প্রশ্ন ওঠে, ঠিক কত দূর পর্যন্ত এই অভিযান চালানো হবে। আর তা নিয়েই ১৭ জুলাই সকালে সাময়িক বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয় এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই উচ্ছেদ থমকে যাওয়ায় শহরজুড়ে নানা কৌতূহল ছড়ায়।

অবশেষে দীর্ঘ বৈঠকের পর সমস্ত জট কাটিয়ে ওই দিন বিকেলের দিকে উচ্ছেদের কাজ শুরু হয়। যে কোনও সময় বাধা আসতে পারে, এই আশঙ্কা থেকে অনেক রাত পর্যন্ত বুলডোজার চালিয়ে ঘাটাল শহরের সিংহভাগ বেআইনি নির্মাণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে উচ্ছেদের টালবাহানা চলছিল, তাই অনেক ব্যবসায়ীই ভেবেছিলেন এগুলো কেবলই প্রশাসনের ফাঁকা হুমকি। শেষ পর্যন্ত হয়তো দোকান ভাঙা হবে না। কিন্তু হঠাৎ করে বুলডোজার দিয়ে ভাঙতে শুরু করায় বহু ব্যবসায়ী তাঁদের দোকানের পরিকাঠামো সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ পাননি। চোখের সামনেই ধুলোয় মিশে যায় বহু মানুষের রুটিরুজির সম্বল। ওই সমস্ত অতিসাধারণ পরিবারের মানুষদের চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়।
ওই উচ্ছেদের পর শহরজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। সরকারি জায়গার উপর দখল করে যাঁরা ব্যবসা করছিলেন, তাঁদের বিপুল ক্ষতির বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে কষ্টদায়ক লাগলেও সিংহভাগ মানুষের মনেই স্বস্তি ফিরেছিল। কারণ, ঘাটাল-মেচোগ্রাম রাস্তার সার্ভিস রোড দীর্ঘদিন ধরে বেদখল হয়ে থাকার কারণে যানজট ও দুর্ঘটনার যে নিত্যদিনের যন্ত্রণা ছিল, তা থেকে মানুষ মুক্তি পেয়েছিলেন। পথচারী থেকে শুরু করে নিত্যযাত্রীরা সুস্থভাবে চলাফেরা করতে পারছিলেন। প্রশাসনের দাবি ছিল, প্রত্যেক দখলদারকে আগে থেকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের ডেকে শুনানিরও ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্মাণ ভেঙে নেননি বলেই প্রশাসনকে পূর্বনির্দিষ্ট কর্মসূচি অনুযায়ী কড়া পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল।
কিন্তু শহরবাসীর সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কয়েক দিন যেতে না যেতেই ফের পুরনো চেহারায় ফিরতে শুরু করেছে ঘাটাল শহর। রাস্তার দু’ধার ফের দখল হয়ে যাচ্ছে। আর এই দৃশ্য দেখেই ক্ষোভে ফুঁসছেন সাধারণ মানুষ। তাঁদের কথায়, প্রশাসন কি পারত না, দখল উচ্ছেদের পর থেকে নিয়মিত  পুলিশ ও প্রশাসনের কড়া নজরদারি বা মনিটরিং চালিয়ে নতুন করে কাউকে বসতে না দেওয়ার ব্যবস্থা করতে? একদিন হঠাৎ করে বুলডোজার চালিয়ে গরিব মানুষদের ভাতে মারার পর এখন কেন প্রশাসন সম্পূর্ণ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে? যদি আগের অবস্থায় ফিরে যেতেই হয়, তবে এত ঢাকঢোল পিটিয়ে পুলিশি পাহারায় উচ্ছেদ অভিযানের কী যৌক্তিকতা ছিল?
শহরবাসীর অভিযোগের তির শাসকদলের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দিকেও। নাগরিক মহলের প্রশ্ন, শাসকদলের নেতারা কি চোখে ঠুলি এঁটে বসে রয়েছেন? তাঁদের প্রচ্ছন্ন মদত ও প্রত্যক্ষ সমর্থন ছাড়া যেমন বুলডোজার চালিয়ে দখলদারদের উচ্ছেদ করা প্রশাসনের পক্ষে সম্ভব ছিল না, ঠিক তেমনই উল্টোদিকে তাঁদের আশীর্বাদ ছাড়া এভাবে ফের রাতারাতি সরকারি জায়গা জবরদখল হয়ে যেত না বলেও মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
উচ্ছেদ হওয়া ব্যবসায়ীদের একাংশের আক্ষেপ, পুনর্বাসনের কোনও নির্দিষ্ট দিশা না দেখিয়ে আসন্ন উৎসবের মুখে তাঁদের এভাবে পথে বসানো অত্যন্ত অমানবিক সিদ্ধান্ত। অথচ এখন প্রভাবশালীদের আনুকূল্যে অনেকেই ফের দোকান সাজিয়ে বসছেন। সব মিলিয়ে, সাধারণ মানুষের করের টাকায় তৈরি করা প্রশস্ত সার্ভিস রোডগুলি ফের সঙ্কুচিত হয়ে যাওয়ায় প্রশাসনিক সদিচ্ছা নিয়েই সর্বস্তরে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। এই পরিকল্পিত ‘ভাঙাগড়া’র খেলায় আখেরে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন হয়রানি আর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই জুটল না।
এদিকে ঘাটালের বিধায়ক শীতল কপাট বলেন, আমরা খুব শীঘ্রই প্রগতি বাজারটিকে বিদ্যাসাগর স্কুল মাঠের পশ্চিম দিকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করব। সেই সঙ্গে বর্তমান প্রগতি মার্কেটের জায়গাটিতে এক সুপার মার্কেট কমপ্লেক্স তৈরি হবে যেখানে বহু ব্যবসায়ীর কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা থাকবে। কিন্তু ঘাটাল মহকুমা প্রশাসনের এক আধিকারিক বলেন, আমাদের প্রত্যেকটি  পদক্ষেপই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মতো করতে হয়। তাই এনিয়ে আমি কোনও মন্তব্য করব না।

তৃপ্তি পাল কর্মকার

আমার প্রতিবেদনের সব কিছু আগ্রহ, উৎসাহ ঘাটাল মহকুমাকে ঘিরে... •ইমেল: [email protected] •মো: 9933066200 •ফেসবুক: https://www.facebook.com/triptighatal •মোবাইল অ্যাপ: https://play.google.com/store/apps/details?id=com.myghatal.eportal&hl=en ইউটিউব: https://www.youtube.com/c/SthaniyaSambad