কেয়া মণ্ডল চৌধুরী,‘স্থানীয় সংবাদ’, ঘাটাল: বর্ষার আকাশে মেঘ জমলেই ঘাটালবাসীর বুকের মধ্যে যেন একটাই ভয়, বন্যা। শিলাবতী, ঝুমি, কংসাবতী, রূপনারায়ণ সহ নদ-নদীর জল বাড়তে শুরু করলেই মহকুমার বিস্তীর্ণ এলাকা জলের তলায় চলে যায়। কোথাও বাড়ির মধ্যে জল, কোথাও রাস্তার উপর দিয়ে নৌকা, কোথাও আবার গবাদি পশুর সঙ্গে চিলেকোঠায় আশ্রয় নিতে হয় মানুষকে। যাঁদের সেই আশ্রয়টুকুও নেই, তাঁদের যেতে হয় ত্রাণশিবিরে। বন্যা আসে, মানুষের ঘর ডোবে, জল নামে, আবার নতুন করে ঘর বাঁধে। পরের বছর আবার একই ছবি। প্রশ্ন, আর কতদিন?
ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের ইতিহাস আজকের নয়। ১৯৫০ এর দশকেই তৎকালীন বাম সাংসদ নিকুঞ্জবিহারী চৌধুরী ঘাটালের বন্যা সমস্যা নিয়ে প্রথম দাবি তুলেছিলেন। ১৯৫৯ সালে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সরকারের সময়ে মান সিংহের নেতৃত্বে একটি কমিটি ঘাটালের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে খতিয়ে দেখে। সেই সময় নির্দিষ্ট কত টাকা বরাদ্দ হয়েছিল, তার নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। পরে ১৯৮০ সালে পরিকল্পনাটি অনুমোদন পায়। ১৯৮২ সালে প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় ৫০ কোটি টাকা কিন্তু বরাদ্দ হয়েছিল ৩০ লক্ষ টাকা। ওই বছর ১০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন সেচমন্ত্রী প্রভাস রায় শিলাবতী নদীর তীরে রুপোর কোদাল দিয়ে প্রকল্পের শিলান্যাস করেন। তারপর? শিলান্যাসের পর কেটে গেল ৪৪বছর, কিন্তু ঘাটালের বন্যার কি পরিবর্তন হলো?
২০০৯ সালে আবার প্রকল্প পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত হয়। ২০১০ সালে নতুন ডিপিআর করে গঙ্গা ফ্লাড কন্ট্রোল কমিশনে জমা পড়ে। পরে সংশোধিত ডিপিআরও জমা হয় এবং কেন্দ্রীয় স্তরে অনুমোদনের প্রক্রিয়া এগোয়। ২০১৫ নাগাদ প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ১,২৪০ কোটি টাকা ধরা হয়েছিল। কিন্তু অর্থের জটিলতায় প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ কাজ আর বাস্তবায়িত হয়নি। এত পরিকল্পনা, এত রিপোর্ট, এত অনুমোদনের পরও ঘাটালবাসীর কোনো দুর্ভোগ কাটল না।
২০১৪ সালে ঘাটালের সাংসদ হওয়ার পর দীপক অধিকারী(দেব) বারবার সংসদে মাস্টার প্ল্যানের দাবি তুলেছেন এবং ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে ,মাস্টার প্ল্যান না হলে ভোটে প্রার্থী হতে তিনি অস্বীকার করেন। বাধ্য হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার, কেন্দ্রের অর্থের অপেক্ষা না করে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিজেদের অর্থে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার কথা ঘোষণা করে। এবং ২০২৫ সালের রাজ্য বাজেটে ৫০০ কোটি টাকা মাস্টার প্ল্যানের জন্য বরাদ্দ করে।
এরপর কিছু কাজ এগিয়েছে। নদী ও খাল সংস্কার, পাম্প হাউস, স্লুইস গেট, বাঁধ, খাল সংযোগ ও জমি সংক্রান্ত কাজ শুরু হয়েছে। কৃষ্ণনগরে পাম্প হাউসের কাজ এগিয়েছে। বিভিন্ন বাঁধ ও খালের সংস্কার নিয়ে কাজ চলছে। কিন্তু সব জায়গায় কাজের গতি এক নয়। কোথাও জমি, কোথাও প্রশাসনিক অনুমোদন, কোথাও আবার অর্থের কারণে কাজ ধীর গতিতে হয়েছে। তাহলে কোন কাজ কতটা হয়েছে, কোথায় আটকে আছে, আর কবে শেষ হবে,তার পরিষ্কার হিসাব কি ঘাটালবাসী কোনও দিন পাবেন না?
ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের কাজ শুধু বাঁধ তৈরি নয়। নদী ও খালের নাব্যতা বাড়ানো, নিয়মিত সংস্কার, স্থায়ী বাঁধ, লকগেট ও স্লুইস গেট, পাম্প হাউস, জলনিকাশি ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় রাস্তা ও পরিকাঠামো তৈরি, সবই এর মধ্যে রয়েছে। কিন্তু ঘাটালের সমস্যা কি শুধু নদী-খালেই সীমাবদ্ধ? নদীবাঁধের বিপজ্জনক এলাকায় বসতি কমিয়ে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হবে কবে? ফাঁকা জায়গায় পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ হবে কবে? মনশুকা ও রসিকগঞ্জের অসম্পূর্ণ কাজ শেষ হবে কবে? চন্দ্রেশ্বর খালের কাজ শুরু করে অতিরিক্ত জল রূপনারায়ণে নামানোর ব্যবস্থা কবে হবে?
রাজনৈতিক শিবিরে রঙের পরিবর্তন হয়েছে। শুরুতে তেরঙ্গা, একসময় লাল, পরে সবুজ, আবার গেরুয়া। সরকার বদলেছে, জনপ্রতিনিধি বদলেছেন, প্রতিশ্রুতিও বদলেছে। কিন্তু বদলায়নি ঘাটালবাসীর জলযন্ত্রণা।
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বীরসিংহে সভার আগে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘাটালের বন্যাকবলিত এলাকাগুলি আকাশপথে পরিদর্শন করেন। তারপর ঘোষণা করেন, চলতি অর্থবর্ষে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের জন্য ১,২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হবে। কেন্দ্র ও রাজ্য ৫০ শতাংশ করে অর্থ বহন করবে। তিনি বলেন দুর্যোগ মোকাবিলা দফতরের জন্যেও অর্থের ব্যবস্থা হবে। দুর্গাপুজোর পর কাজের গতি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও তিনি দিয়েছেন। আগামী জুন ২০২৭এর মধ্যে প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য অংশ এগিয়ে নেওয়া বা শেষ করার লক্ষ্যমাত্রাও তিনি দিয়েছেন। এবার তাই ঘাটালবাসীর প্রশ্ন আরও স্পষ্ট, এই ১,২০০ কোটি টাকা কি সত্যিই কাজে লাগবে? পুজোর পর কাজ কতটা দ্রুত এগোবে? আগামী বর্ষার আগে ঘাটালের মানুষ কি তার ফল দেখতে পাবে?
১৯৫৯ থেকে ২০২৬, প্রায় সাত দশকের অপেক্ষা। সরকার বদলেছে, প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে, প্রতিশ্রুতি এসেছে একের পর এক। শুধু বদলায়নি ঘাটালবাসীর জলযন্ত্রণা। এবার মানুষ আর শিলান্যাস চান না, প্রতিশ্রুতি চায় না। তাঁরা চান মাস্টার প্ল্যান সম্পূর্ণ হোক। ঘাটালবাসীর জলযন্ত্রণা মুক্ত হোক।