এই মুহূর্তে ক্রীড়া/অনুষ্ঠান অন্যান্য সাহিত্য সম্পাদকীয় নোটিশবোর্ড

E-Paper

জলের লড়াইয়েই কাটছে অনন্তকাল, ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান কি মেটাতে পারবে ঝুমির যন্ত্রণা?

Published on: February 13, 2026 । 9:13 PM
দেবপ্রসাদ পাঠক বন্দ্যোপাধ্যায়
দেবপ্রসাদ পাঠক বন্দ্যোপাধ্যায়
ঘাটাল মহকুমা আদালতের একজন স্বনামধন্য বরিষ্ঠ আইনজীবী। দিনের অধিকাংশ সময় আইনের জটিল যুক্তি-তর্ক এবং পেশাগত পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও, শত ব্যস্ততার মাঝে নিজের মৌলিক চিন্তাভাবনা ও সামাজিক চিত্র নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে কলম ধরতে ভালোবাসেন।
📞 +919433256773 WhatsApp

দেবপ্রসাদ পাঠক বন্দ্যোপাধ্যায়, আইনজীবী, ঘাটাল মহকুমা আদালত: বর্ষা এলেই ঘাটালবাসীর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। স্মারণাতীতকাল ধরে এই জনপদের মানুষের জীবন আবর্তিত হচ্ছে বন্যার জলচিত্রকে সঙ্গী করে। ঘাটাল পুরসভার এক থেকে বারো নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের কাছে এই দুর্ভোগ যেন এক অলঙ্ঘ্য নিয়তি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই অঞ্চলের উচ্চতা মাত্র পাঁচ মিটার। ফলে ফি বছর চন্দ্রকোণা, গড়বেতা বা বাঁকুড়া থেকে বয়ে আসা অতিবৃষ্টির জল যখন জনপদ ছাপিয়ে হু-হু করে ঢুকতে শুরু করে, তখন মানুষের ভরসা হয়ে দাঁড়ায় তালগাছ বা পিচ ড্রাম দিয়ে তৈরি সেই আদি ও অকৃত্রিম ‘ডোঙ্গা’। ২০ শতাংশ মানুষের জল পারাপারের নিত্যসঙ্গী এই যানটি আজও হার মানেনি আধুনিকতার কাছে। সামর্থ্যবানদের বাড়িতে নৌকো থাকে পরিবারের সদস্যদের মতোই আদরে, যাকে সারা বছর নিয়ম করে পরিচর্যা করতে হয়।
এই জনপদের গঠনটিও বেশ অদ্ভুত। আড়গোড়া, কৃষ্ণনগর, আলামগঞ্জ বা নিশ্চিন্দিপুরের রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় চোখে পড়বে প্রতিটি বসতবাড়ি রাস্তার লেভেল থেকে প্রায় ৩০-৩২ ফুট উঁচুতে তৈরি। মাটির কিংবা কংক্রিটের ঢিপির ওপর বাড়ি তৈরির এই রেওয়াজ চলে আসছে আদ্যিকাল থেকে। অবশ্য বাণিজ্যিক প্রয়োজনেই হোক বা দোকানপাট, রাস্তার সমান্তরালে যে সব ইমারত মাথা তুলেছে, সেগুলির নকশাও করা হয়েছে বন্যার কথা মাথায় রেখে। দোকানের সরঞ্জাম যাতে দ্রুত দোতলা বা তিনতলায় তুলে ফেলা যায়, সেই ব্যবস্থাই সেখানে প্রধান। ১৮৬৯ সালে যে এলাকাগুলি ‘বি’ ওয়ার্ড নামে পরিচিত ছিল, সেই ৮১টি মৌজার অন্তর্গত অবতল ভূমির চিত্র আজও বদলায়নি। অথচ পরিসংখ্যান বলছে, চন্দ্রকোনার উচ্চতা ২৮ মিটার, খড়ার সাড়ে ছ’মিটার কিংবা বিষ্ণুপুরের ৫৯ মিটার উচ্চতার জলরাশি ভৌগোলিক নিয়মেই রূপনারায়ণের অববাহিকায় সাড়ে তিন মিটার উচ্চতায় আছড়ে পড়ে পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।
বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে প্রস্তাবিত ‘ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান’ নিয়ে। আজ থেকে ২০০ বছর আগেও যে ভাবে মাঠঘাট ছাপিয়ে জল এই নিচু এলাকায় জমে থাকত, আজও তার ব্যতিক্রম হয় না। মাস্টার প্ল্যানের রূপকাররা কি পারবেন এই জমা জলের স্থায়ী সমাধান করতে? প্রশ্ন উঠছে কমিটির বিশেষজ্ঞ চয়ন নিয়েও। একজন অভিজ্ঞ ভূগোলের শিক্ষক কি এই কমিটিতে থাকলে ভালো হত না? গুরুদাসনগর পার হয়ে মনশুকা পর্যন্ত গেলে দেখা যাবে ঝুমির কঙ্কালসার চেহারা। নদীর গর্ভ সংস্কারের অভাবে ভয়াবহ ভাবে বুজে গিয়েছে। বাঁশের সাঁকোর নীচ দিয়ে নদী আর বয় না, যেন থমকে দাঁড়িয়ে থাকে পলি। অভিযোগ উঠেছে, নদী থেকে বালি বা মাটি তোলার ক্ষেত্রে প্রশাসন ‘নো কস্ট’ বা ‘বিনা খরচ’ পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ ঠিকাদাররা মাটি তুলে তা বিক্রি করে নিজেদের খরচ মেলাবেন, সরকার কোনও টাকা দেবে না। এই বিমাতৃসুলভ সিদ্ধান্তের কারণেই ড্রেজার দিয়ে মাটি তোলার কাজ কার্যত প্রহসনে পরিণত হয়েছে।
ঝুমি নদীর এই বেহাল দশা আর ডিভিসির ছাড়া লক্ষ লক্ষ কিউসেক জলের দাপটে প্রতি বছর যে বিভীষিকা তৈরি হয়, তাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় রাজনৈতিক তরজা। শাসক পক্ষ একে ‘ম্যান মেড’ বা ‘মানুষের তৈরি’ বন্যা বলে কেন্দ্রের বঞ্চনাকে দায়ী করে। কিন্তু ভৌগোলিক বাস্তব আর নদী সংস্কারের এই উদাসীনতা যে সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। মাস্টার প্ল্যান কি সত্যিই আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এই ঢালু জমির জলচিত্র বদলে দিতে পারবে, নাকি ডাইরি বা ড্রেজারের ভান চলতেই থাকবে, এখন সেটাই দেখার।

নিউজ ডেস্ক

‘স্থানীয় সংবাদ’ •ঘাটাল •পশ্চিম মেদিনীপুর-৭২১২১২ •ইমেল: [email protected] •হোয়াটসঅ্যাপ: 9933998177/9732738015/9932953367/ 9434243732 আমাদের এই নিউজ পোর্টালটি ছাড়াও ‘স্থানীয় সংবাদ’ নামে একটি সংবাদপত্র, MyGhatal মোবাইল অ্যাপ এবং https://www.youtube.com/SthaniyaSambad ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে।