জগন্নাথ রায়, স্থানীয় সংবাদ: বিকশিত ভারত ১৪০ কোটি ভারতবাসীর স্বপ্ন হলেও ২৫ ছাত্রযুব এর কাছে এটি একটি সংকল্প। ২০৪৭ সালে ভারতবাসী যখন তার ১০০ তম স্বাধীনতা দিবস পালন করবে তখন ভারতবর্ষকে যেভাবে দেখতে পাবে তার একটি দূরদর্শী পরিকল্পনা। বিকশিত ভারতের স্বপ্ন দেশের বর্তমান সরকার ও আপামর দেশবাসীর কাছে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি দৃঢ় অঙ্গীকার। বিকশিত ভারত যেমন আর্থিকভাবে শক্তিশালী হবে ঠিক তেমনি সামাজিক ও পরিবেশগত ভাবেও উন্নত হবে। একটি দীর্ঘমেয়াদী সুপরিকল্পিত স্থিতিশীল উন্নয়নের মধ্য দিয়ে আমাদের দেশের আর্থিক, সামাজিক, অবকাঠামো, কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ, প্রতিরক্ষা, বিজ্ঞান, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ, আধুনিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিসেবা এবং পরিবেশ সুরক্ষায় ভারত হবে বিশ্বে একটি শক্তিশালী ও উন্নত জাতি।
বিকশিত ভারত ২০৪৭ এর মূল লক্ষ্য সমূহ:-
বিকশিত ভারত এর মূল লক্ষ্য হলো। ২০৪৭ সালে দেশের সকল নাগরিকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে আর্থিক শ্রীবৃদ্ধি ঘটানো, যাতে সকল দেশবাসী একটি উচ্চমানের জীবনযাত্রা উপভোগ করতে পারে। বিকশিত ভারতের গৃহীত লক্ষ্যমাত্রা গুলি হল,- ১. উন্নত অর্থনীতি:- ২০৪৭ এ ভারতকে একটি উচ্চ অর্থনীতির দেশে পরিণত করা। ওই সময় দেশের জিডিপি ৩০ – ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। ২. দারিদ্র্যমুক্ত দেশ:- ২০৪৭ সালের মধ্যে সমস্ত দেশবাসীকে দারিদ্র্যসীমার নিচে থেকে তুলে আনা ও এর জন্য প্রয়োজনীয় অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্প গুলি বাস্তবায়ন ঘটানো। ৩. অবকাঠামোগত উন্নয়ন:- সমগ্র দেশে বিশ্বমানের অবকাঠামো নির্মাণ করা। যেমন, স্মার্ট সিটি নির্মাণ, এক্সপ্রেসওয়ে, হাইওয়ে, বুলেট ট্রেন করিডর, ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডর, মেট্রো রেল, আধুনিক এয়ারপোর্ট, সমুদ্র বন্দর ও নতুন নতুন শিল্প করিডর এর নির্মাণ। ৪. প্রযুক্তিগত উন্নয়ন:- শিক্ষা,স্বাস্থ্য, পরিষেবা সমস্ত ক্ষেত্রেই আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সর্বাধিক প্রয়োগ ঘটিয়ে ওই সমস্ত ক্ষেত্র গুলির শ্রীবৃদ্ধি ঘটানো। ৫. উচ্চ মাথাপিছু আয়:- সকল দেশবাসীর ন্যূনতম ১৮০০০ – ২১০০০ ডলার আয় নিশ্চিত করে উন্নত জীবনমান সুনিশ্চিত করা। ৬. আত্মনির্ভরশীলতা:- কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ, প্রতিরক্ষা, গবেষণা প্রভৃতি প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেশকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলা। ৭. পরিবেশগত উন্নয়ন:- দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে পুনর্নবীকরণ যোগ্য শক্তির সর্বাধিক ব্যবহার করা, যাতে করে পরিবেশ সুরক্ষা ও বিশ্ব উষ্ণায়নকে রোধ করা যায়। ৮. বৈশ্বিক নেতৃত্ব:- বাণিজ্য, কূটনীতি ও ভূ- রাজনীতিতে দেশকে বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দেওয়া।
বিকশিত ভারত ২০৪৭ রূপায়ণে গৃহীত পদক্ষেপ সমূহ:-
দেশকে ২০৪৭ সালের মধ্যে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে বর্তমান সরকার যে সমস্ত পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করেছে তা হল,- ১. পিএম গতিশক্তি:-
পিএম গতিশক্তি হলো দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে একটি সুসংহত পরিকল্পনা যা ১৬ টিরও বেশি মন্ত্রণালয়কে একযোগে একটি প্লাটফর্মে নিয়ে এসে দেশের সড়ক,রেল, আকাশ ও জলপথের উন্নয়ন ঘটানো। সেইসঙ্গে দেশের নতুন শিল্প করিডর স্থাপন, বিশেষ আর্থিক অঞ্চল নির্মাণ, স্মার্ট সিটি প্রভৃতি পরিকল্পনাগুলির বাস্তবায়ন ঘটানো। ২. ডিজিটাল ইন্ডিয়া:- এই প্রকল্পের মাধ্যমে সমগ্র দেশে উচ্চ গতির ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদান। এই লক্ষ্যে দেশে একাধিক ডেটা সেন্টারে নির্মাণ। সেই সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ ঘটিয়ে দেশের সমস্ত অফিস আদালতকে পেপার লেস করার একটি সুদৃঢ় পরিকল্পনা। ৩. মেক ইন ইন্ডিয়া এবং আত্মনির্ভর ভারত:- কৃষি, শিল্প, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রভৃতি সমস্ত ক্ষেত্রেই দেশকে আত্মনির্ভর করে তোলায় হল এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। ৪. এম এস ওয়াই উন্নয়ন:- দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলিতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও নিযুক্ত কর্মীদের আর্থিক শ্রীবৃদ্ধি ঘটাতে এই প্রকল্প। ৫. স্টাট আপ ইন্ডিয়া:- দেশের শিক্ষা,স্বাস্থ্য, শিল্প, মহাকাশ গবেষণা, প্রতিরক্ষা, বিনোদন প্রভৃতি ক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্যোক্তাকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য এই স্কিম উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। ৬. নবীকরণ যোগ্য শক্তি ব্যবহার:-
স্থিতিশীল উন্নয়ন ও ক্রমাগত জলবায়ু পরিবর্তন রোধে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার সর্বাধিক উৎপাদন নবীকরণযোগ্য শক্তি যেমন সৌর বিদ্যুৎ, বায়ু শক্তি থেকে উৎপাদন করা। ৭. কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন:- কৃষি কেন্দ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন ঘটাতে ও কৃষকের আয় বৃদ্ধি করার জন্য একাধিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। যেমন পিএম কিষান, পিএম ফসল বীমা যোজনা প্রভৃতি। ৮. স্মার্ট সিটি মিশন:– এই পরিকল্পনায় দেশে ১০০ টিরও বেশি আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রিত সুপরিকল্পিত মার্সসিটি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিকশিত ভারত ২০৪৭ এর লক্ষ্য অর্জনের অন্তরায়:- ২০৪৭ এর মধ্যে ভারতকে বিকশিত করার যে উচ্চাভিলাসী স্বপ্ন বর্তমান সরকার ও ভারতবাসী দেখছে এর পথে বেশ কিছু আর্থসামাজিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। যেমন,- ১. বেকারত্ব:- দেশের ক্রমবর্ধমান শিক্ষিত যুবসমাজের জন্য এখনো পর্যন্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সেভাবে বৃদ্ধি পায়নি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছদ্ম বেকারত্ব ও মুরসুমি বেকারত্ব লক্ষণীয়। ২. আয় বৈষম্য:- দেশে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে আয় বৈষম্য তীব্র বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা বিকশিত ভারতের স্বপ্ন পূরণে অন্তরায়। ৩. ডিজিটাল বৈষম:- দেশের প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চল গুলিতে দ্রুতগতির ইন্টারনেটের সুবিধা এখনো সঠিক ভাবে পৌঁছায় না। ৪. কৃষি সংকট:- ভারতে কৃষি বর্তমান সময় পর্যন্ত অত্যন্ত জলবায়ু নির্ভর। ফলে মাঝেমধ্যেই কৃষি উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হয় ফলে কৃষিজাত উৎপাদন হ্রাস বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়। জনবহুল দেশ হওয়ায় কৃষি উৎপাদন এর হ্রাস বৃদ্ধি অর্থনীতির উপর গভীর প্রভাব ফেলে। ৫. নগরায়নের উপর চাপ:- দ্রুত নগরায়নের লক্ষ্যে প্রায়সই অপরিকল্পিত শহর ও নগরের বিস্তার লক্ষ্য করা যায়। নগরের অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ সামলানো অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর ফলে শহর ও নগরের মধ্যে অপরিকল্পিত নিকাশি ব্যবস্থা ও আবর্জনা স্তূপ লক্ষ করা যায়। ৬.জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত ঝুঁকি:- ক্রমবর্ধমান পরিবেশ অবক্ষয়, চরম আবহাওয়ার ঘটনা এবং সম্পদের অভাব টেকসই উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধিকে হুমকির মুখে ফেলছে।
ভারতের জন্য বিকশিত ভারত ২০৪৭-এর গুরুত্ব:- বিকশিত ভারত ২০৪৭ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় রূপকল্প, যার লক্ষ্য হলো ভারতীয় স্বাধীনতার শতবর্ষ পূর্তির মধ্যে ভারতকে একটি উন্নত, আত্মনির্ভরশীল এবং বিশ্বব্যাপী প্রভাবশালী দেশে রূপান্তরিত করা। উন্নত জীবনযাত্রার মান:- এই রূপকল্পের মূল লক্ষ্য হলো সকল নাগরিকের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন এবং মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করা। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি:- যুব, নারী, দরিদ্র ও কৃষকের মতো প্রধান গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে এটি নিশ্চিত করে যে উন্নয়নের সুফল সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছায় এবং বৈষম্য হ্রাস পায়। বৈশ্বিক নেতৃত্ব:- এটি বৈশ্বিক শাসন, বাণিজ্য এবং উদ্ভাবনে ভারতের অবস্থানকে শক্তিশালী করে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে এর প্রভাব বৃদ্ধি করে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি:- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো উদীয়মান প্রযুক্তিতে নেতৃত্বকে উৎসাহিত করে, যা ভবিষ্যৎ-উপযোগী প্রবৃদ্ধিকে চালিত করে। স্থিতিশীল উন্নয়ন:- দীর্ঘমেয়াদী বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য নিশ্চিত করতে পরিবেশ সুরক্ষা, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং জলবায়ু কার্যক্রমের ওপর গুরুত্বারোপ করে। জাতীয় ঐক্য ও দীর্ঘমেয়াদী রূপকল্প:- এটি একটি ঐক্যবদ্ধকারী জাতীয় লক্ষ্য হিসেবে কাজ করে, যা ২০৪৭ সালের মধ্যে একটি উন্নত ভারত গড়ার অভিন্ন উদ্দেশ্যের দিকে নীতিমালা, প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং নাগরিকদের এক সারিতে নিয়ে আসে।








