• তৃপ্তি পাল কর্মকার, ‘স্থানীয় সংবাদ’, ঘাটাল: শিক্ষক দিবসের মত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিনে স্কুলের বাথরুমে গিয়ে অত্যন্ত অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে এবং কদর্যপূর্ণ ভাষায় ভিডিও বানিয়েছে অষ্টম শ্রেণির একদল ছাত্রী। সে ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। ভিডিও হয়তো একদল ছাত্রীর মধ্যেই কেউ করেছিল, সেখান থেকে একে তাকে পাঠাতে গিয়েই ভাইরাল। বিষয়টি জানাজানি হতেই দাসপুর- ২ ব্লকের নবীন মানুয়া ঈশ্বরচন্দ্র হাইস্কুল কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসেছে। স্কুল সূত্রে জানা গিয়েছে ওই ছাত্রীদের অভিভাবকদের ডেকে তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অনেকে স্কুলকে দোষারোপ করছেন, কেউ দুষছেন ওদের বাবা-মাকে। একটু বিশদে ভেবে দেখবেন তো, সত্যি কি স্কুল বাথরুম পর্যন্ত নজরদারি করতে পারে? একটা স্কুলে বহু ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে, সবার পিছনে নজরদারি করা সত্যি কি স্কুলের পক্ষে সম্ভব? টিনএজ এমন একটা সময় যেখানে একটা বেপরোয়া মনোভাব তৈরি হয়। টিনএজাররাও যে স্বতন্ত্র মানুষ, তাদেরও যে স্বতন্ত্র মতামত রয়েছে, সেটা বারবার প্রমাণ করতে চায়। পরিবারের লোকজনের কাছে সব সময় সেটা চলে না। দাবড়ে দুবড়ে বা কয়েক ঘা উত্তম মধ্যম দিয়ে সেই আনাড়ি স্বতন্ত্রতাকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়। তাহলে ওই স্বতন্ত্রতা দেখানোর জায়গা রইল কোথায়? রইল বন্ধু বান্ধব। সেখানে বন্ধুদের কাছে এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে যাতে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। সে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি বা কথাবার্তা যে কোনও কিছুই হতে পারে! কে কতটা উপস্থাপন করতে পারে তার উপরেই নির্ভর করে বন্ধুদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা। একজন অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি বা ভাষা শুরু করলেই অন্যজনকেও তো দেখাতে হবে আসলে সে ওর থেকে বেশি জানে। সেও প্রমাণ দিতে শুরু করে। একে অন্যের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করতে থাকায় বিষয়টা চলে যায় বহুদূর। এখন আবার হাতে মোবাইল। যে কেউ ভিডিও করল। সেই ভিডিও এ হাত সে হাত হতে হতে ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে।
মহকুমার অভিভাবক মহলের একাংশের দাবি ছিল স্কুলের তরফে ওদের কাউন্সেলিং করার ব্যবস্থা করা হোক। সেই সাথে খতিয়ে দেখা হোক ওই মেয়েগুলির সাথে তাদের অভিভাবকদের সম্পর্ক কতটা নিবিড়। পরিবারের সাথে নিবিড় সম্পর্ক না থাকলে সেটাও অনেক সময় বেপরোয়া জীবন যাপনের কারণ হয়। দরকার হলে ওদের বাবা মায়েদেরও কাউন্সেলিং করার প্রয়োজন। তাছাড়া এই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। তার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব থেকে যাবে এই টিনএজারদের মধ্যে। ওরা পেশাদার অপরাধী নয়, তাই শাস্তির পাশাপাশি ওদের শোধরানোর সুযোগ দেওয়া হোক এই দাবি ছিল অভিভাবক স্থানীয়দের।
স্কুল অভিনব শাস্তির মধ্যে দিয়ে শোধরানোর সুযোগ দিয়েছে এবং সেটা মহকুমার সর্বত্র প্রশংসাও কুড়িয়েছে। বিদ্যালয়ের টিআইসি শুভ্রপ্রকাশ মণ্ডল জানান, ওই ছাত্রীরা স্কুলের প্রার্থনার লাইনে সমস্ত পড়ুয়ার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভুল স্বীকার করে এবং বিদ্যালয়ের গৌরব ক্ষুণ্ণ করার জন্য ক্ষমা চায়। পাশাপাশি, সেপ্টেম্বর মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত তাদের সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে শুধু স্কুলে আসা বন্ধ করে দেওয়াই নয়, এই সময়টাকে পড়াশোনা ও আত্মসংশোধনের কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। প্রতিটি বিষয়ে ৫০ নম্বরের অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে ছাত্রীদের। বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, অঙ্ক ও সংস্কৃত—প্রতিটি বিষয়ের জন্য মডেল তৈরি অথবা লিখিত প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে অ্যাসাইনমেন্ট সম্পূর্ণ করতে হবে।
এর পাশাপাশি নৈতিক ও মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে তিনটি মূল্যবোধের বই পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অক্টোবর মাসে স্কুলে ফিরে প্রতিটি বই থেকে ১০ পাতা করে মোট ৩০ পাতায় নিজেদের উপলব্ধি ও ভাবনা লিখে জমা দিতে হবে।
বিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্তে খুশি অভিভাবকরাও। স্কুল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, শাস্তির পাশাপাশি পড়াশোনা ও মূল্যবোধের শিক্ষার মাধ্যমে ছাত্রীদের ভুল বুঝিয়ে সংশোধনের পথেই ফেরানোই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
টিনএজারদের মধ্যে বহু আচরণগত সমস্যা দেখা যায়, ঠিক কখন মনোবিদের কাছে যাওয়া উচিত? পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য বিভাগের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সোহম পালুইয়ের পরামর্শ, ‘‘বয়ঃসন্ধির সময়ে বাবা-মা বা পরিবারের থেকে সন্তানরা কিছুটা আলাদা থাকতে পছন্দ করে, সেটা স্বাভাবিক । যদি মনে হয় আপনার থেকে সন্তান হঠাৎ কথা বলা কমিয়ে দিয়েছে, বা চেষ্টা করেও অল্প কথার বেশি এগোচ্ছে না, মিশতে পারছেন না, বেশিরভাগ সময়ে দরজা বন্ধ করে আলাদা থাকছে, ক্লাসে রেজাল্ট হঠাৎ খারাপ হচ্ছে, আচরণ খুব বদলে গেছে, তখন মনোবিদের পরামর্শ নিন। অনেক সময় স্কুলের শিক্ষক বা পাড়া-প্রতিবেশীরা কিছু পরিবর্তন দেখলে বাবা-মায়ের কাছে অভিযোগ জানান, সেটাকেও তলিয়ে দেখুন। তৎক্ষণাৎ রিয়্যাক্ট না করে সন্তানের সাথে কথা বলুন সরাসরি। উত্তরের মধ্যে উত্তেজিত হয়ে পড়া বা অসংগতি দেখলে পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন অনেক সময় রাগ বা উত্তেজিত হয়ে পড়া হতাশার ও বহিঃপ্রকাশ।’’