‘আজ ১৩ আগস্ট—ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সহধর্মিণী দিনময়ী দেবীর প্রয়াণ দিবস’— সুমন বিশ্বাস
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ১৮৮৮ সালের ১৩ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয়।দিনময়ী দেবীর জীবন নিয়ে তথ্য তুলনামূলকভাবে অপ্রতুল। অথচ বিদ্যাসাগরের মতো এক মহীরুহের জীবনের নেপথ্যে থাকা এই নারীর নীরব উপস্থিতি, সংসারভার এবং ত্যাগের কথা স্মরণ না করলে ইতিহাসের একটি মানবিক অধ্যায় অসম্পূর্ণ থেকে যায়।পর্দার আড়ালে থাকা এক নীরব আলোকবর্তিকা—দিনময়ী দেবীইতিহাস কখনও কখনও বড় নির্মম।
সে মঞ্চের আলোয় দাঁড় করিয়ে রাখে কিছু মানুষকে, আর তাঁদের পাশে সারাজীবন নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলিকে ঠেলে দেয় অন্ধকারের প্রান্তে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর—বাংলার নবজাগরণের এক অমর নাম। তাঁর বিদ্যার দীপ্তি, সমাজসংস্কারের সাহস, বিধবা বিবাহের আন্দোলন, নারীশিক্ষার প্রসার, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অসীম মানবিকতা—সবই আমাদের ইতিহাসের গর্ব।কিন্তু সেই মহীরুহের ছায়ায়, সংসারের অন্তরালে, এক নীরব নারীও তাঁর জীবনযাত্রার অংশ হয়ে ছিলেন—দিনময়ী দেবী।আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে তাই তাঁকে শুধু ‘বিদ্যাসাগরের স্ত্রী’ বলে স্মরণ করলে হয়তো তাঁর প্রতি যথার্থ সম্মান দেখানো হবে না। তাঁকে মনে করতে হবে একজন মানুষ হিসেবে—একজন স্ত্রী, একজন মা, একজন গৃহিণী এবং এক দীর্ঘ নীরবতার ভিতর দিয়ে জীবনকে বহন করে চলা এক নারী হিসেবে।
১৮৩৪ সালে ক্ষীরপাই নিবাসী শত্রুঘ্ন ভট্টাচার্যের কন্যা দিনময়ী দেবীর সঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্রের বিবাহ হয়। তখন দুজনেই অতি অল্পবয়সি। পরবর্তীকালে ঈশ্বরচন্দ্র হয়ে উঠলেন ‘বিদ্যাসাগর’—জ্ঞান, যুক্তি ও মানবতার এক বিরল প্রতীক। কিন্তু তাঁর কর্মজীবনের বিস্তৃত পরিসরের বাইরে ছিল এক সংসার, যার অনেকখানি ভার দিনময়ী দেবীকেই বহন করতে হয়েছিল।
বিদ্যাসাগরের জীবন ছিল কর্মমুখর। সমাজসংস্কারের জন্য তিনি ছুটেছেন এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন, নারীশিক্ষার প্রসারে কাজ করেছেন, বিধবা বিবাহের পক্ষে সমাজের প্রবল বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর সামনে ছিল বৃহত্তর সমাজ, বৃহত্তর মানবতা।
আর সেই বৃহত্তর মানবতার সাধনার পেছনে পড়ে থেকেছে একটি ছোট্ট সংসার।
সেই সংসারের নীরব কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন দিনময়ী।
ঐতিহাসিক বিবরণে তাঁর গৃহস্থালির কাজ, সংসারের দায়িত্ব এবং পরিবারের প্রতি তাঁর নিবেদনের কথা পাওয়া যায়। একটি স্মৃতিচিত্রে তাঁকে সারাদিন নানা রকম পরিশ্রমে ব্যস্ত থাকা এক গৃহিণী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর নিজের শিক্ষার আকাঙ্ক্ষার কথাও জানা যায়—বিদ্যাসাগর তাঁকে পড়াশোনা শেখানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কিন্তু পারিবারিক পরিবেশের কারণে সেই উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
কী আশ্চর্য এক সময় ছিল!
যে মানুষটি বাংলার মেয়েদের শিক্ষার অধিকার নিয়ে সমাজের সঙ্গে লড়াই করলেন, তাঁর নিজের ঘরের নারীটির শিক্ষাজীবনও শেষ পর্যন্ত নানা সামাজিক ও পারিবারিক বাধায় থমকে গেল।
ইতিহাসের এই বৈপরীত্য আমাদের ভাবায়।
বিদ্যাসাগর ছিলেন সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তোলা এক মানুষ। কিন্তু তাঁর নিজের সংসারও যে সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতার বাইরে ছিল না—দিনময়ী দেবীর জীবন যেন তারই এক নীরব দলিল।
তবু দিনময়ী দেবীর জীবনকে কেবল বঞ্চনার গল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
তিনি ছিলেন সংসারের মানুষ। ছিলেন মমতার মানুষ। ছিলেন পরিবারের আশ্রয়।
পুত্র নারায়ণচন্দ্রকে ঘিরে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তাঁর মতভেদের কথাও বিভিন্ন স্মৃতিচারণে এসেছে। কিন্তু সেই মতভেদের মধ্যেও একজন মায়ের হৃদয় যে সন্তানের জন্য কাঁদত, তার আভাস পাওয়া যায় তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ে। মৃত্যুশয্যায় পুত্রের জন্য তাঁর আকুলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানেই দিনময়ী দেবী আমাদের কাছে আরও মানবিক হয়ে ওঠেন।
একজন মা শেষ মুহূর্তেও নিজের সন্তানের কথা ভাবেন।
জীবনের সমস্ত অভিমান, দুঃখ, দূরত্ব, অপ্রাপ্তি—সবকিছুর ওপরে উঠে একজন মায়ের হৃদয় যেন তখন শুধু একটি কথাই বলে—
“আমার সন্তানকে ক্ষমা করো।”
১৮৮৮ সালের ১৩ আগস্ট দিনময়ী দেবীর জীবনাবসান ঘটে। তখন বিদ্যাসাগর জীবনের শেষ পর্বে প্রবেশ করেছেন। তাঁর জীবনের বহু প্রিয় মানুষ ইতিমধ্যেই চলে গেছেন। আর এবার চলে গেলেন সেই নারী, যাঁর সঙ্গে তাঁর জীবনের দীর্ঘতম সম্পর্কগুলির একটি জড়িয়ে ছিল।
দিনময়ীর মৃত্যুশয্যার সেই মুহূর্তের বর্ণনায় দেখা যায়, বিদ্যাসাগর তাঁর পাশে ছিলেন। স্ত্রী কোনও ইঙ্গিত করলে তিনি তা বোঝার চেষ্টা করেছিলেন—এমন এক মর্মস্পর্শী স্মৃতিও সংরক্ষিত আছে।
তারপর?
একটি ঘর আরও নিঃসঙ্গ হয়ে গেল।
একটি জীবনের দীর্ঘ অভ্যাস হঠাৎ থেমে গেল।
একটি মানুষ, যিনি সারা জীবন অন্যের দুঃখ মোচনের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর নিজের জীবনে নেমে এল আরও একটি ব্যক্তিগত শোক।
আমরা বিদ্যাসাগরকে স্মরণ করি ‘দয়ার সাগর’ বলে।
কিন্তু সেই সাগরের ঘরে যে একজন নারী নীরবে প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছিলেন, তাঁর নাম দিনময়ী।
তিনি ইতিহাসের মঞ্চে বক্তৃতা দেননি। কোনও আন্দোলনের পতাকা হাতে পথে নামেননি। কোনও বই লেখেননি। তাঁর নামে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাঁর প্রতিকৃতি হয়তো আমাদের পাঠ্যবইয়ের পাতায় স্থান পায়নি।
তবু তাঁর জীবন ছিল ইতিহাসেরই একটি নেপথ্য অধ্যায়।
কারণ প্রত্যেক মহান মানুষের জীবনের পেছনে শুধু তাঁর নিজের সাধনা থাকে না—থাকে অসংখ্য নীরব মানুষের সহিষ্ণুতা, অপেক্ষা, ত্যাগ ও ভালোবাসা।
দিনময়ী দেবী ছিলেন সেই নীরবতার এক প্রতীক।
তাঁকে তাই করুণার চোখে নয়, শ্রদ্ধার চোখে দেখতে হবে।
তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাস শুধু যারা সামনে থেকে লড়েছেন তাদের দিয়ে তৈরি হয় না; ইতিহাস তৈরি হয় তাঁদের দিয়েও, যারা ঘরের ভিতর থেকে সেই লড়াইয়ের মূল্য বহন করেছেন।
আজ ১৩ আগস্ট, তাঁর প্রয়াণ দিবসে তাই গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি দিনময়ী দেবীকে।
যে নারী নিজে ইতিহাসের আলোয় দাঁড়াননি, কিন্তু ইতিহাসের এক মহান পুরুষের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে ছিলেন—
তাঁর নীরবতাকেও আজ আমরা শব্দ দিতে চাই।
তাঁর অদৃশ্য ত্যাগকেও আজ আমরা প্রণাম করতে চাই।
তাঁর বিস্মৃত নামটিকেও আজ ইতিহাসের পাতায় একটু জায়গা করে দিতে চাই।
দিনময়ী দেবী,
আপনি হয়তো চেয়েছিলেন না খ্যাতি, চাননি কোনও স্মারক, চাননি কোনও অমরত্ব।
কিন্তু সময়ের ওপারে দাঁড়িয়ে আজ আমরা বলতেই পারি—আপনার নীরব জীবনও বৃথা যায়নি।
কারণ যে মানুষটি বাংলার সমাজকে বদলানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁর জীবনের অন্তরালে আপনারও ছিল এক নীরব উপস্থিতি।
আজ আপনার প্রয়াণ দিবসে সেই নীরব উপস্থিতির প্রতি—শতকোটি প্রণাম।শ্রদ্ধায় স্মরণ করি দিনময়ী দেবীকে।
শ্রদ্ধায় স্মরণ করি ইতিহাসের সেইসব নীরব নারীদের, যাঁদের ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়েই বহু মহৎ মানুষের জীবন পূর্ণতা পেয়েছে।
‘আজ ১৩ আগস্ট—ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সহধর্মিণী দিনময়ী দেবীর প্রয়াণ দিবস’— সুমন বিশ্বাস






