কাজলকান্তি কর্মকার[M-9933066200], ঘাটাল: আজ পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করলেন কেন্দ্রীয় অর্থ ও কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের এই বাজেটে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সাধারণ মানুষের সক্ষমতা বাড়ানো এবং ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’—এই তিনটি মূল কর্তব্যের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভারতের বিকাশের গতি বজায় রাখাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে রাজকোষ ঘাটতি জিডিপির ৪.৩ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
দেশের শিল্প পরিকাঠামো মজবুত করতে সেমিকন্ডাক্টর মিশন ২.০ চালু করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ওষুধ শিল্পে ভারতকে বিশ্বজনীন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে ‘বায়োফার্মা শক্তি’ প্রকল্পের ঘোষণা করা হয়েছে, যার জন্য আগামী ৫ বছরে ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। বস্ত্র শিল্পের আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে মেগা টেক্সটাইল পার্ক এবং খাদি ও হস্তশিল্পের জন্য মহাত্মা গান্ধী গ্রাম স্বরাজ উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। পণ্য পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য পূর্বের ডানকুনি থেকে পশ্চিমের সুরাট পর্যন্ত নতুন পণ্য পরিবহণ করিডর এবং ২০টি নতুন জাতীয় জলপথ চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে একগুচ্ছ নতুন দিশা দেখিয়েছে এই বাজেট। আগামী ৫ বছরে ১ লক্ষ সহযোগী স্বাস্থ্য পেশাদার তৈরি এবং ৫টি আঞ্চলিক মেডিক্যাল হাব স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রেও বড় পদক্ষেপ হিসেবে ৫টি বিশ্ববিদ্যালয় টাউনশিপ এবং প্রতি জেলায় মেয়েদের হস্টেল গড়ার কথা বলা হয়েছে। পর্যটনের প্রসারে বারাণসী থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত হাইস্পিড রেল করিডর এবং ১৫টি পুরাতাত্ত্বিক স্থানকে নতুন করে সাজিয়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষকদের আয় বাড়াতে ‘ভারত-বিস্তার’ নামক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ভিত্তিক সরঞ্জামের কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
কর পরিকাঠামোতেও আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস থেকে নতুন আয়কর আইন কার্যকর হবে। ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহৃত করযোগ্য সামগ্রীর শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এছাড়া ১৭টি ওষুধের ওপর আমদানি শুল্ক কমানো এবং ৭টি বিরল রোগের ওষুধে পুরোপুরি শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা করা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ টানতে এবং তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করতে একগুচ্ছ কর ছাড়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মধ্যবিত্তের স্বস্তিতে বিদেশে পর্যটন ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে কর সংগ্রহের হার বা টিসিএস কমানো হয়েছে। সব মিলিয়ে এক উন্নত ও বিকশিত ভারত গড়ার লক্ষ্যেই এই বাজেট সাজানো হয়েছে বলে দাবি সরকারের।
•আয়কর ও সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে পরিবর্তন: মধ্যবিত্ত ও বিনিয়োগকারীদের জন্য বাজেটে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী এপ্রিল ২০২৬ থেকে নতুন আয়কর আইন কার্যকর হতে চলেছে, যা বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি সহজবোধ্য হবে।
•বিদেশে ভ্রমণ ও চিকিৎসা: এখন থেকে বিদেশে ঘুরতে যাওয়ার প্যাকেজ কিনলে কর সংগ্রহের হার (TCS) ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ২ শতাংশ করা হয়েছে। এছাড়া বিদেশে পড়াশোনা বা চিকিৎসার জন্য টাকা পাঠালেও করের হার কমে ২ শতাংশ হচ্ছে।
•ওষুধের দাম কমবে: ক্যানসার বা অন্যান্য বিরল রোগের জীবনদায়ী ওষুধের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। মোট ১৭টি ওষুধের ওপর শুল্ক কমানোর ফলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসার খরচ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
•শেয়ার বাজার: ছোট বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থে শেয়ারের ‘বাইব্যাক’-এর ওপর কর এখন মূলধনী লাভের ভিত্তিতে দিতে হবে। তবে ফিউচার ও অপশনস (F&O) লেনদেনের ক্ষেত্রে সিকিউরিটিজ ট্রানজ্যাকশন ট্যাক্স কিছুটা বাড়ানো হয়েছে।
•কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধির দিশা: তরুণ প্রজন্মের জন্য বাজেটে কর্মসংস্থানের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। সরকার সরাসরি শিল্পমহলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দক্ষ কর্মী তৈরির পরিকল্পনা করেছে।
•স্বাস্থ্য পরিষেবা: আগামী ৫ বছরে ১ লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী বা সহযোগী স্বাস্থ্য পেশাদার তৈরি করা হবে। এছাড়া দেশের পাঁচটি অঞ্চলে নতুন মেডিক্যাল হাব তৈরি হবে, যা ভারতকে চিকিৎসা পর্যটনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলবে।
•ছাত্রীদের জন্য হস্টেল: উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়াতে দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে গার্লস হস্টেল তৈরির জন্য আর্থিক সহায়তার কথা বলা হয়েছে।
•নতুন প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ: ভিএফএক্স, গেমিং এবং কমিক্সের মতো আধুনিক ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ বাড়াতে ১৫ হাজার স্কুল ও ৫০০টি কলেজে বিশেষ ল্যাব তৈরি করা হবে।
•পরিবহণ ও পরিকাঠামোয় নতুন গতি: যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করতে সরকার রেল ও জলপথে বড় বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে।বারাণসী-শিলিগুড়ি হাইস্পিড রেল: পর্যটন এবং ব্যবসার সুবিধার্থে বারাণসী থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত হাইস্পিড রেল করিডর তৈরি করা হবে। পশ্চিমবঙ্গের জন্য এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা। জলপথের বিস্তার— আগামী ৫ বছরে ২০টি নতুন জাতীয় জলপথ চালু করা হবে। এছাড়া পণ্য পরিবহণের খরচ কমাতে ডানকুনি থেকে সুরাট পর্যন্ত তৈরি হবে বিশেষ পণ্যবাহী করিডর।
•কৃষকদের জন্য ‘ভারত-বিস্তার’: কৃষকদের সরাসরি আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করতে ‘ভারত-বিস্তার’ নামক একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অ্যাপ চালু করা হবে। এর মাধ্যমে কৃষকরা চাষবাসের উন্নত পদ্ধতি এবং আবহাওয়ার আগাম তথ্য নিজেদের ভাষায় জানতে পারবেন। এছাড়া উচ্চমূল্যের ফসল যেমন কাজু, চন্দন ও কোকো চাষে উৎসাহ দিতে বিশেষ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।







