সুমন বিশ্বাস:১৮ আগস্ট, ১৯৪৫।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষপ্রহর। পৃথিবী তখন যুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। আর এশিয়ার আকাশে উড়ে চলেছে একটি বিমান—গন্তব্য অজানা ভবিষ্যৎ, সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতার স্বপ্নে জ্বলতে থাকা এক দুর্বার মানুষ—নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।
তাইহোকু—আজকের তাইপেই।
সেই আকাশেই ঘটেছিল সেই রহস্যময় বিমান দুর্ঘটনা, যে ঘটনা আজও ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম গভীর রহস্য হয়ে আছে।
সরকারি ও ঐতিহাসিকভাবে প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইহোকু বিমানবন্দরের কাছাকাছি বিমানটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে এবং গুরুতরভাবে আহত নেতাজির মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন, অনুসন্ধান ও বিতর্ক চলে এসেছে। ফলে “নেতাজি সত্যিই সেদিন মারা গিয়েছিলেন কি না”—এই প্রশ্নটি আজও বহু মানুষের মনে অমীমাংসিত।
কিন্তু ইতিহাসের পাতার বাইরে নেতাজি যেন আরও বড় এক সত্য।
তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি পরাধীনতার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করেছিলেন—
“তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।”
তাঁর কাছে স্বাধীনতা ছিল না কেবল একটি রাজনৈতিক দাবি; স্বাধীনতা ছিল আত্মমর্যাদার অন্য নাম।
তাই কারাগার তাঁকে থামাতে পারেনি, নির্বাসন তাঁকে থামাতে পারেনি, বিপদ তাঁকে থামাতে পারেনি। ইউরোপ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া—মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন ভারতের মুক্তির পথ খুঁজতে।
তারপর এল ১৮ আগস্ট।
তাইহোকুর আকাশে আগুন জ্বলল।
একটি বিমান ভেঙে পড়ল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—একজন মানুষের শরীর হারিয়ে গেলেও তাঁর স্বপ্ন হারিয়ে গেল না।
আজও যখন আগস্টের আকাশে মেঘ জমে, মনে হয়—সেই মেঘের আড়ালে কি কোথাও লুকিয়ে আছে সেই বজ্রকণ্ঠ?
“জয় হিন্দ!”
নেতাজির অন্তর্ধান তাই শুধু একটি বিমান দুর্ঘটনার গল্প নয়। এটি ভারতীয় চেতনায় এক অসমাপ্ত অধ্যায়। তাঁর শেষ পরিণতি নিয়ে যত প্রশ্নই থাকুক, তাঁর জীবন ও সংগ্রামের সত্যটি অমোঘ—তিনি স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন, স্বাচ্ছন্দ্য এবং ভবিষ্যৎ সবকিছু বাজি রেখেছিলেন।
তাইহোকুর সেই আকাশ হয়তো একজন সুভাষকে আমাদের চোখের আড়াল করেছিল,
কিন্তু ভারতের কোটি মানুষের হৃদয় থেকে তাঁকে কখনও মুছে দিতে পারেনি।
কোনও কোনও মানুষ চলে যান,
কিন্তু তাঁদের পদচিহ্ন থেকে যায় ইতিহাসের বুকে।
কোনও কোনও কণ্ঠ স্তব্ধ হয়,
কিন্তু তার প্রতিধ্বনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকে।
নেতাজিও তেমনই এক অমর প্রতিধ্বনি।
১৮ আগস্ট তাইহোকুর আকাশের দিকে তাকালে তাই প্রশ্নের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে একটি অনুভূতি—
যে মানুষটি স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন,
তিনি হয়তো আমাদের চোখের সামনে নেই;
কিন্তু তাঁর স্বপ্নের ভারত এখনও আমাদের হাতে।
জয় হিন্দ।
নেতাজি অমর থাকুন।
‘তাইহোকুর আকাশে হারিয়ে যাওয়া এক অমর সূর্য নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তর্ধান ও ১৮ আগস্ট’— সুমন বিশ্বাস







