সুমন বিশ্বাস ,ভূতপূর্ব মহকুমা: শাসক মানুষের জীবন শেষ হয় মৃত্যুর মধ্য দিয়ে, কিন্তু কিছু মানুষের কর্ম, আদর্শ আর মানবপ্রেম মৃত্যুকেও অতিক্রম করে বেঁচে থাকে যুগের পর যুগ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সেই বিরল মহামানবদের একজন—যাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় জুড়ে ছিল মানুষের জন্য অকৃত্রিম ভালোবাসা, আর মৃত্যুর পরেও যিনি মানুষের উপকার করে গেছেন। বাংলা তারিখ অনুযায়ী ১২৯৮ সালের ১৩ই শ্রাবণ যে মহামানব আমাদের ছেড়ে পরলোকে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি আর কেউ নন, বাঙালি জাতির মেরুদন্ড – বিদ্যাসাগর মহাশয়। সারা জীবন তিনি নিঃস্বার্থভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অসহায়ের মুখে অন্ন তুলে দিয়েছেন, দরিদ্র ছাত্রের হাতে বই তুলে দিয়েছেন, সমাজের অন্ধ কুসংস্কারের বিরুদ্ধে একাই সংগ্রাম করেছেন। অথচ তাঁর জীবদ্দশায় তিনি যতটা সম্মান পাওয়ার যোগ্য ছিলেন, তার চেয়ে অনেক বেশি পেয়েছিলেন সমালোচনা, কটুক্তি আর অবহেলা। তবুও তিনি থেমে যাননি; কারণ তাঁর কাছে মানুষের কল্যাণই ছিল জীবনের একমাত্র সাধনা।নিমতলা মহাশ্মশানে তাঁর শেষযাত্রার যে ঐতিহাসিক আলোকচিত্রটি আজও আমাদের চোখে জল এনে দেয়, সেটি তুলেছিলেন আলোকচিত্রী শরৎচন্দ্র সেন। জীবনের কঠিন সময়ে তিনি দিল্লিতে ব্যবসায় ভয়াবহ লোকসানের মুখে পড়ে কলকাতায় ফিরে নতুন করে জীবন শুরু করেছিলেন। ঠিক সেই সময়েই তাঁর ডাক পড়ে বিদ্যাসাগরের শেষ মুহূর্তের সেই ছবি ধারণ করার জন্য।ছবিটি তোলার সময় বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। উপস্থিত শবযাত্রীরা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে মরদেহটিকে সামান্য উপরে তুলে ধরেন, যাতে তাঁর মুখটি ছবিতে ধরা পড়ে। সেই একটিমাত্র আলোকচিত্রই পরবর্তীকালে বাংলার অসংখ্য ঘরে পৌঁছে যায়। মানুষ শ্রদ্ধাভরে সেই ছবি সংগ্রহ করে নিজেদের ঘরে স্থান দেন, তিনি যে বাঙালি জাতির ঈশ্বর তাই ঠাকুরের মত পূজিত হয়ে চলেছেন আবহমান কাল ধরে।পরবর্তীকালে শরৎচন্দ্র সেন গসাগর মহাশয়ের কৃপায় তাহার চতুর্গুণ লাভ করিয়াছি। একটি কথা আপনাদিগকে প্রাণ ভরিয়া বলিতেছি—বিদ্যাসাগর মহাশয় জীবিত থাকিয়া অনেকের অনেক উপকার করিয়াছিলেন, কিন্তু মৃত্যুর পরেও তিনি আমাভীর আবেগে লিখেছিলেন—”তৎকালে ধনাঢ্য লোকের তো কথাই নাই, মধ্যবিত্ত গৃহস্থ পর্যন্ত এই ছবি কিনিয়া গৃহে রাখিয়া দিয়াছিলেন। দিল্লিতে থাকিয়া যে লোকসান দিয়াছিলাম, কলিকাতায় আসিয়া বিদ্যার এই পরম উপকার করিলেন।”কী আশ্চর্য! যে মানুষটি জীবদ্দশায় অসংখ্য মানুষের জীবন আলোকিত করেছিলেন, তাঁর শেষযাত্রার একটি ছবিও আরেক মানুষের জীবনকে নতুন করে দাঁড় করিয়ে দিল। মৃত্যুর পরেও তিনি যেন তাঁর করুণার হাত বাড়িয়ে রেখেছিলেন।তাহলে কি তিনি শুধুই একজন সমাজসংস্কারক? শুধুই একজন শিক্ষাবিদ? শুধুই ‘বর্ণপরিচয়’-এর রচয়িতা? নাকি মাতৃভক্ত এক আদর্শ সন্তান? না—ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এই সব পরিচয়েরও ঊর্ধ্বে। তিনি ছিলেন এক অনন্য মানবতাবাদী, এক অসীম হৃদয়ের মানুষ।আজ, তাঁর প্রয়াণ দিবসে, আমরা শুধু তাঁকে স্মরণই করি না—নিজেদেরও প্রশ্ন করি, তাঁর দেখানো মানবতার পথ থেকে আমরা কতটা শিক্ষা নিতে পেরেছি?আসুন, আধুনিক ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্থপতি, নারীশিক্ষার অগ্রদূত, বিধবা বিবাহ আন্দোলনের পথিকৃৎ এবং সর্বোপরি মানবতার এক উজ্জ্বল প্রতীক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি। তাঁর আদর্শকে ধারণ করাই হোক তাঁর প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি।

মৃত্যুর পরেও যিনি মানুষের উপকার করে গেছেন






