• সৌমেন মিশ্র, ‘স্থানীয় সংবাদ’, ঘাটাল: মাথার ঘাম পায়ে ফেলে মাঠে আলু ফলিয়েছিলেন চাষিরা। ভেবেছিলেন, ভালো ফলন হয়েছে, এবার হয়তো সংসারে একটু স্বস্তি ফিরবে। কিন্তু সেই ভালো ফলনই এখন যেন তাঁদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঠে দাম না মেলায় অনেক আলু নষ্ট হয়েছে। যা কিছু বাঁচানো গিয়েছিল, তা চড়া দামে হিমঘরে মজুত করেছিলেন চাষিরা। আশা ছিল, সময় গেলে দাম বাড়বে। কিন্তু সেই আশাও আজ দুশ্চিন্তায় পরিণত হয়েছে।
হিমঘরে মজুত আলুর দাম তলানিতে। আলু বিক্রি করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে চাষিদের। ভিন রাজ্যে আলু রফতানি হলেও সেভাবে খদ্দের নেই বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। ফলে হিমঘরে পড়ে থাকা আলুর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে ঘুম উড়েছে চন্দ্রকোণার চাষিদের।
অধিক ফলনের জেরে এবছর মাঠে আলুর দাম পাননি চাষিরা। দাম না মেলায় মাঠেই অনেক আলু পড়ে নষ্ট হয়েছে। এরপর হিমঘরে আলু মজুত করার সময় চাষিদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। চড়া দামে হিমঘরে আলু মজুত করে এখন বিপাকে পড়েছেন তাঁরা। হিমঘরে মজুত অধিকাংশ আলুই চাষিদের। অথচ সেই আলু এখন কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
হিমঘর থেকে আলু কিনে ভিন রাজ্যে রফতানি করেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের দাবি, আলুর দাম নেই, তার উপর ভিন রাজ্যেও সেভাবে খদ্দের মিলছে না। তৃণমূল সরকারের ভিন রাজ্যে আলু রফতানি নিয়ে ভুল নীতিকেই দায়ী করছেন অনেকে। অভিযোগ, আগের তৃণমূল সরকার আলু রফতানিতে লাগাম দেওয়ায় ভিন রাজ্যের বাজার নষ্ট হয়েছে। যদিও নতুন সরকারের তরফে ভিন রাজ্যে আলু রফতানিতে আগেই ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। ভিন রাজ্যে আলু রফতানিতে ভর্তুকি দেওয়ার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও ব্যবসায়ীদের দাবি, এখনও সরকারের তরফে তেমন কোনও নির্দেশিকা আসেনি।
দেশে আলু উৎপাদনে অন্যতম রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। হুগলি জেলার পর পশ্চিম মেদিনীপুরেও বড় অংশে আলু চাষ হয়। আর আলু চাষের গড় হিসেবে পরিচিত চন্দ্রকোণা। আলু মজুতের জন্য জেলায় মোট ৯১টি হিমঘর রয়েছে। চন্দ্রকোণা বিধানসভা এলাকায় হিমঘর রয়েছে ৩০টি।
ব্যবসায়ী সংগঠনের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবছর জেলার ৯১টি হিমঘরে মোট ৩ কোটি ৬৩ লাখ ২৭ হাজার ২৭৮ প্যাকেট আলু মজুত হয়েছে। ৩১ জুলাই পর্যন্ত হিমঘরগুলি থেকে আলু বিক্রি হয়েছে ১ কোটি ১২ লাখ ৫৬ হাজার ৬৪৫ প্যাকেট। বর্তমানে জেলায় হিমঘরে আলু বিক্রির পরিমাণ প্রায় ৩১ শতাংশ। যা ৮ থেকে ১০ শতাংশ কম বলে মনে করছে আলু ব্যবসায়ী সংগঠনগুলি।
অপরদিকে চন্দ্রকোণায় ২৯টি হিমঘরে আলু মজুত হয়েছে ১ কোটি ১৫ লাখ ৬৫ হাজার ৭৬৪ প্যাকেট। এখনও পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে ৩৮ লাখ ১৫ হাজার ৮৬২ প্যাকেট। অর্থাৎ চন্দ্রকোণায় মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ আলু বিক্রি হয়েছে। এখনও প্রায় ৭০ শতাংশ আলু হিমঘরেই পড়ে রয়েছে।
এই ৭০ শতাংশ আলুই এখন কৃষকদের চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। হিমঘরের অন্ধকার ঘরে পড়ে থাকা প্রতিটি আলুর বস্তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একজন কৃষকের সারা বছরের পরিশ্রম। জড়িয়ে রয়েছে ঋণ, সংসারের খরচ, ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, পরিবারের ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সেই আলু যদি সময়ের মধ্যে বিক্রি না হয়, তাহলে কী হবে–এই চিন্তাই এখন তাড়া করে বেড়াচ্ছে আলু চাষিদের।
চাষি থেকে ব্যবসায়ী ও হিমঘর সংগঠন সকলেরই আশঙ্কা, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ডিসেম্বর মাসে হিমঘর খালি করতে হয়। এরপর দু’মাস হিমঘর মেরামতের কাজ চলে। মার্চ মাস থেকে আবার নতুন আলু মজুত শুরু হয়ে যায়। ফলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে রফতানি ও খুচরো বাজারে এই বিপুল পরিমাণ আলু বিক্রি করা প্রায় অসম্ভব হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে আলু ব্যবসায়ী সংগঠনগুলি।
হিমঘর সূত্রে জানা যায়, শুরুতে ২০০ প্যাকেট আলু মজুত করতে ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। শেষের দিকে দাম কমে ৪০ হাজার টাকা খরচে হিমঘরে আলু মজুত করেন কৃষকেরা। অথচ বর্তমানে হিমঘরে ২০০ প্যাকেট আলুর দাম ২৩ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চাষের খরচ, হিমঘরে রাখার খরচ সব মিলিয়ে এখন হিসেব মেলাতে পারছেন না চাষিরা। যে ফসল ফলিয়ে সংসার চালানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই ফসলই আজ তাঁদের লোকসানের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেরই চাষের খরচটুকুও উঠছে না। ফলে তাঁদের প্রশ্ন, এইভাবে চললে চাষি বাঁচবেন কীভাবে?
হিমঘরে মজুত আলু ও খুচরো বাজারে আলুর দামের মধ্যে ফারাক নিয়েও প্রশ্ন