
‘ভাসাপুলের জন্মদিন’— কলমে সুমন বিশ্বাস
ঘাটালের ভাসাপুলকে ঘিরে ২২ সেপ্টেম্বরের দিনটি ঘাটালবাসীর কাছে শুধু একটি তারিখ নয়—এটি ইতিহাস, স্মৃতি, নদী আর মানুষের ভালোবাসায় জড়িয়ে থাকা এক বিশেষ দিন। ১৯০৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ভাসাপুলটি সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল; সেই কারণেই দিনটিকে ভাসাপুলের ‘জন্মদিন’ হিসেবে স্মরণ করা হয়।ঘাটালের ভাসাপুল—নদীর বুকে ভেসে থাকা এক টুকরো ইতিহাস
শিলাবতীর জল বয়ে যায় আপন মনে। কখনও শান্ত, কখনও উচ্ছল; কখনও তার জলে নীল আকাশের ছায়া, কখনও বর্ষার ঘোলা স্রোতে জীবনের কঠিন গল্প। সেই শিলাবতীর বুকের ওপর সারি সারি নৌকাকে পাশাপাশি বেঁধে, তার ওপর কাঠ ও বাঁশের পাটাতন বসিয়ে তৈরি হয়েছিল যে আশ্চর্য সেতু—সেটিই ঘাটালের ঐতিহাসিক ভাসাপুল।
এই ভাসাপুলের ইতিহাস প্রায় দেড় শতাব্দীর। প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৮৫০ সালে ওয়াটসন সাহেবের উদ্যোগে শিলাবতীর ওপর নৌকার সাহায্যে একটি পন্টুন সেতু তৈরি হয়। প্রথমদিকে সাধারণ মানুষের জন্য সেটি উন্মুক্ত ছিল না; মূলত সাহেব ও তাঁদের কর্মীরাই এটি ব্যবহার করতেন। পরে Bengal Ferries Act-এর অধীনে ১৯০৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ভাসাপুলটি সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। সেই দিনটিই আজ তার জন্মদিন হিসেবে স্মরণীয়। কথিত আছে বাঙালি হিসাবে বিদ্যাসাগর মহাশয় এই সেতু পেরোতে পারতেন। তাঁর কাছে এই সেতু পেরোনোর অনুমতি ছিল।
কিন্তু ভাসাপুল কেবল ইট-পাথর বা কাঠ-বাঁশের কোনও স্থাপনা নয়। এটি যেন ঘাটালের দুই পাড়ের মানুষের হৃদয়ের সেতু। একদিকে বাজার, পুরসভা ও শহরের ব্যস্ততা; অন্যদিকে প্রশাসনিক দফতর, আদালত ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান—দুই তীরের মানুষের যাতায়াতে দীর্ঘদিন ধরে এই ভাসাপুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। এখনও স্কুল-কলেজের পড়ুয়া, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষ এর ওপর দিয়ে শিলাবতী পার হন।
সময়ের সঙ্গে পাকা সেতু এসেছে। আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা এসেছে। তবু ভাসাপুল হারিয়ে যায়নি। কারণ, কিছু জিনিসের মূল্য শুধু তার ব্যবহারিক প্রয়োজন দিয়ে মাপা যায় না। ভাসাপুলের মূল্য তার স্মৃতিতে।
কত প্রজন্মের পদচিহ্ন জমেছে তার কাঠের পাটাতনে! কত ছাত্র প্রথম স্কুলে যাওয়ার পথে এর ওপর দিয়ে হেঁটেছে, কত মানুষ জীবিকার সন্ধানে নদী পার হয়েছে, কত গল্প, হাসি, অভিমান আর অপেক্ষা এই সেতুর সঙ্গে মিশে আছে—তার হিসাব কোনও ইতিহাসের বইয়ে লেখা নেই।
শিলাবতী নদী নিজেই ঘাটালের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই নদীকে কেন্দ্র করে একসময় ঘাটাল একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। নদীপথে ব্যবসা-বাণিজ্য চলত, স্টিমারও চলাচল করত। আর সেই নদীর বুকেই ভাসাপুল হয়ে উঠেছে ঘাটালের নিজস্ব পরিচয়ের একটি অংশ।
২০০০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ভাসাপুল হেরিটেজ স্বীকৃতিও পায়, যা তার ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও প্রতিষ্ঠা করে।
আজ যখন তার জন্মদিনের কথা মনে পড়ে, তখন মনে হয়—একটি সেতুরও কি জন্মদিন হতে পারে?
হ্যাঁ, পারে।
যে সেতু শুধু নদী পার করে না, সময়কেও পার করায়, তার জন্মদিন অবশ্যই হতে পারে।
ভাসাপুল তাই আজও দাঁড়িয়ে আছে ঘাটালের স্মৃতির প্রহরী হয়ে—শিলাবতীর ঢেউয়ের সঙ্গে কথা বলে, পুরনো দিনের গল্প শোনায়, আর নতুন প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেয়—
“উন্নতির পথে এগিয়ে যাও, কিন্তু নিজের ইতিহাসকে কখনও পিছনে ফেলে যেও না।”
আজ ভাসাপুলের জন্মদিনে তাই ঘাটালের এই ঐতিহ্যের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
শিলাবতীর বুকে ভেসে থাকা এই সেতু বেঁচে থাকুক আরও বহু প্রজন্ম—ঘাটালের গর্ব হয়ে, মানুষের স্মৃতির সেতু হয়ে
শুভ জন্মদিন, ঘাটালের ভাসাপুল।
**তুমি শুধু একটি সেতু নও—তুমি ঘাটালের ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়।**








