কেয়া মণ্ডল চৌধুরী ‘স্থানীয় সংবাদ’, ঘাটাল: পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মভিটে বীরসিংহ থেকে দীর্ঘদিন পর ফের সরকারি বাস পরিষেবা চালু হওয়ায় এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের একটি প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। কিন্তু নতুন এই বাস পরিষেবা নিয়ে খড়ারের বাসিন্দাদের মধ্যে অন্য একটি দাবি উঠেছে। তাঁদের দাবি, বীরসিংহের বদলে খড়ার শহর থেকেই যদি সরকারি বাসের যাত্রা শুরু হয়, তাহলে বীরসিংহের পাশাপাশি খড়ারের বহু মানুষও এই পরিষেবার সুবিধা পাবেন।
বীরসিংহ থেকে খড়ার শহরের দূরত্ব মাত্র দু-তিন কিলোমিটার। খড়ার একটি পূর্ণাঙ্গ পৌরসভা এবং সেখানে জনবসতিও তুলনামূলক বেশি। প্রতিদিন খড়ার ও পার্শ্ববর্তী এলাকার বহু মানুষ বিভিন্ন কাজে ঘাটাল, মেচোগ্রাম, হাওড়া ও কলকাতার দিকে যাতায়াত করেন। তাই খড়ার থেকে বাস চালু হলে যাত্রী সংখ্যাও অনেক বেশি হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের বক্তব্য, বাসটি খড়ার থেকে ছাড়লেও বীরসিংহের উপর দিয়েই মূল গন্তব্যের দিকে যাবে। ফলে বীরসিংহের যাত্রীদের কোনও অসুবিধা হবে না। বরং দুই এলাকার মানুষই এই পরিষেবার সুবিধা পাবেন।
উল্লেখ্য, গত ২১ জুলাই থেকে বীরসিংহ থেকে দক্ষিণবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ সংস্থার (এসবিএসটিসি) বাস চলাচল শুরু হয়েছে। ক্ষীরপাই ডিপো থেকে নিয়ন্ত্রিত বাসটি প্রতিদিন সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে বীরসিংহ থেকে ছেড়ে সিংহডাঙা তথা বীরসিংহ তোরণ, ঘাটাল ও মেচোগ্রামের উপর দিয়ে হাওড়া হয়ে ধর্মতলায় পৌঁছচ্ছে। ফেরার পথে দুপুর ৩টের সময় ধর্মতলা থেকে বীরসিংহের উদ্দেশে বাসটি রওনা দিচ্ছে। বিকেল ৩টা ৪০ মিনিট নাগাদ হাওড়ায় পৌঁছে সেখান থেকে ফের বীরসিংহের উদ্দেশে যাত্রা করছে। ক্ষীরপাই ডিপো থেকে বীরসিংহ যাতায়াতের পথে কোনও যাত্রী তোলা বা নামানো হয় না।
ক্ষীরপাই ডিপোর ইনচার্জ সৌমেন দাস জানিয়েছেন, স্থানীয়দের দাবির কথা মাথায় রেখে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বীরসিংহ থেকে অন্যান্য রুটেও আরও কয়েকটি সরকারি বাস চালু করা হবে। এর ফলে এলাকার সাধারণ মানুষ থেকে নিত্যযাত্রী সকলেরই কলকাতা যাতায়াতে সুবিধা হবে।
তবে খড়ারের বাসিন্দাদের বক্তব্য, শুধু বীরসিংহ থেকে বাস চালু করলেই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবে না। কারণ এর আগেও বীরসিংহ থেকে কলকাতা এবং বীরসিংহ-হলদিয়া রুটে সরকারি বাস চলাচল করেছিল। বাসগুলি বীরসিংহ থেকে ছাড়লেও মাত্র দু’কিলোমিটার দূরের খড়ার শহরে আসত না। ফলে খড়ারের বহু মানুষ সেই পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হতেন। যাত্রী কম থাকার কারণে বাসগুলি নিয়মিত চলাচল করত না বলেও দাবি স্থানীয়দের।
বাম আমলে বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতির উদ্যোগে রাজ্যজুড়ে সাক্ষরতা অভিযান চলার সময় বিদ্যাসাগরের জন্মস্থান বীরসিংহকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় বীরসিংহকে আদর্শ গ্রাম হিসেবে স্বীকৃতি দেয় তৎকালীন সরকার। ওই সময়ের পরিবহণ মন্ত্রী শ্যামল চক্রবর্তীর উদ্যোগে প্রায় ২৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করে বীরসিংহে একটি কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাস তৈরি করা হয়। সেখান থেকে বীরসিংহ-কলকাতা এবং বীরসিংহ-হলদিয়া রুটে সরকারি বাসও চলাচল শুরু হয়েছিল।
কিন্তু বীরসিংহ থেকে বাস চললেও খড়ার শহরে বাসগুলি না আসায় যাত্রী পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হতো। বীরসিংহ প্রত্যন্ত গ্রাম হওয়ায় বাসের কর্মীদের রাতে থাকা-খাওয়ার সমস্যাও ছিল। অনেক সময় বাস রাতে ঘাটালেই থেকে যেত। পরবর্তীকালে সরকারি নজরদারির অভাবে বাস টার্মিনাসটিও ধীরে ধীরে বেহাল হয়ে পড়ে। একসময় সেখানে বিভিন্ন জিনিসপত্র রাখা, ঘুঁটে দেওয়া, ধান শুকোনো এমনকী গোয়ালঘর হিসেবেও ব্যবহার শুরু করে স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে টার্মিনাসের কাঠামোও চুরি হয়ে যায় এবং একসময় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় বাস চলাচল।
খড়ারের বাসিন্দা পাঁচকড়ি নায়ক বলেন, আগেরবার যদি বাসগুলি খড়ার শহর থেকে যাতায়াত করত, তাহলে পরিষেবা বন্ধ হতো না। এবারেও যদি আগের মতো শুধুমাত্র বীরসিংহ থেকে বাস চালানো হয়, তাহলে বেশি দিন এই পরিষেবা চালু থাকবে না।
খড়ারের দীণেশ রায়, মোনালিসা মাইতি প্রমুখ দাবি তুলে বলেন, মাত্র দু-তিন কিলোমিটার পথ বাড়িয়ে খড়ার শহর থেকে বাস চালু করা হলে খড়ারের বিপুল সংখ্যক মানুষ এই পরিষেবা ব্যবহার করতে পারবেন। একইসঙ্গে বীরসিংহের যাত্রীরাও আগের মতো বাসে উঠতে পারবেন। যাত্রী সংখ্যা বাড়লে পরিষেবাটিও দীর্ঘদিন চালু রাখা সম্ভব হবে। তাই বীরসিংহের পাশাপাশি খড়ারের মানুষের কথা মাথায় রেখে বাসটি খড়ার শহর থেকেই চালানোর বিষয়টি পরিবহণ দপ্তর বিবেচনা করুক,এমনটাই দাবি খড়ারের বাসিন্দাদের।