দেবাশিস কুইল্যা, ‘স্থানীয় সংবাদ’• ঘাটাল: ১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কালজয়ী বাংলা চলচ্চিত্র ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’-র কাহিনীকার ও পরিচালক ছিলেন সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই ছবিটি মদন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস ‘কবিয়াল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ অবলম্বনে নির্মিত হয়েছিল। ছবিটিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার এবং তাঁর বিপরীতে ছিলেন অভিনেত্রী তনুজা। ওই ছবিতে দৃশ্যায়িত কবিগানের লড়াইয়ের আসরের শুটিং হয়েছিল জাড়ার জমিদার রায়দের নাট মন্দিরে। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে জাড়ার জমিদারদের ভূমিকাই নয়, তার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে নিরন্তর গবেষণাধর্মী তথ্য পাওয়া যায় ‘জাড়া গোলক বৃন্দাবন’ গ্রন্থে।
বরদার বিখ্যাত বিশালাক্ষী মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা বরদা-চেতুয়ার রাজা (জমিদার) শোভা সিংহ ঔরঙ্গজেবের আগ্রাসন নীতিতে মুঘলদের বশ্যতা অস্বীকার করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে শেষ পর্যায়ে এমন স্বাধীনচেতা জমিদার ও তার কাহিনী আলোকিত হয়েছে ‘বিদ্রোহী রাজা শোভা সিংহ’ ইতিহাস গ্রন্থে। স্বাধীনতা সংগ্রামী যতীশচন্দ্র ঘোষের উপর গ্রন্থ প্রকাশিত না হলে শুধু অবিভক্ত মেদিনীপুর নয়, রাজ্য ও দেশের মানুষের কাছে ঘাটাল মহকুমার নিজস্ব একটা ইতিহাস আছে, যার শেকড় গভীরে, তা অনেকাংশেই অজানা থেকে যেত। এসব ছাড়াও লোকসংস্কৃতি এবং স্থানিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে নানান প্রবন্ধ জেলা, রাজধানী শহর ছাড়িয়ে প্রথম সারির পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে নিয়মিত।
‘যতীশচন্দ্র ঘোষ: এক অনন্য ব্যক্তিত্ব’(১৩৯৮)। ‘জাড়া গোলক বৃন্দাবন’, ‘বিদ্রোহী রাজা শোভা সিংহ’ নিরলস ক্ষেত্র সমীক্ষা এবং তথ্যানুসন্ধান। নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে তুলে আনেন জাড়ার সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং অজানা কাহিনী, রাজা শোভা সিংহের কাহিনী, অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলা আর দক্ষিণ পশ্চিম বাংলার ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণাধর্মী কাজ ও সাহিত্য রচনার অগ্রপথিকদের মধ্যে অন্যতম রোহিণীনাথ মঙ্গল।
জাড়ার ভূমিপুত্র ১৯৩৮ এর ১৭ জুন পৃথিবীর প্রথম আলো দেখেন মা ইন্দুরেখা মঙ্গলের কোল আলো করে। পিতা ডাঃ যতীন্দ্রকুমার মঙ্গল। হুগলির শ্রীরামপুর কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক মেধাবী ছাত্র শ্রীরামপুরের এক বালিকা বিদ্যালয়ে কর্মজীবন শুরু করেও নিয়মের বাধ্যবাধকতায় স্কুল ছেড়ে হুগলির কোন্নগরে এক কাপড়ের কারখানায় যোগ দেন রোহিনীনাথবাবু। অনিয়মিত বেতন, কারখানায় ধর্মঘট প্রভৃতির কারণে পাঁচ বছর পর শ্রমিকের কাজ ছেড়ে হুগলির হাজিপুর বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের স্থায়ী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে। সসম্মানের সাথে ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে অবসর নেন। বিজ্ঞানের শিক্ষক হয়েও নিজের মাটির কাছাকাছি থাকা তাঁর জাতি, তাঁর মানুষ, মানুষের সৃষ্টি ও সংস্কৃতি নিয়ে আগ্রহ ছিল বরাবর। তাই লোকসংস্কৃতি ও তার ঐতিহ্য ও ইতিহাস সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে কলম ধরেছেন। গবেষণাধর্মী লোকসংস্কৃতি বিষয় নিয়ে রাজ্য ও রাজ্যের বাইরেও বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছ। কর্মজীবন থেকে অবসর নিলেও তার ভাবনা, ভাবনার সাথে বিষয়ের সংযোগ নিয়ে কাগজের উপর থেকে কলমকে বিশ্রাম দেননি কখনও। এখানেই তিনি অনন্য। রেডিও র গান শোনার মধ্যে মনের শান্তি খুঁজে পেতেন। আর পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায় চালিয়েছেন কলম লোকসংস্কৃতি ও তার ঐতিহ্য নিয়ে।
জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সচল রেখেছিলেন কলম। তিনি ঘাটাল মহকুমা ছাড়িয়ে হুগলি, অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলা বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের লোকসংস্কৃতিতে আগ্রহী তরুণ গবেষকদের কাছে এক সচল বর্তিকা। তার লেখা ও আলোচিত বিষয়ের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের অশ্রু ঝরিয়ে অমৃতলোকে পাড়ি দিলেন ১৭ জুলাই ২০২৬ এর ভোরে আত্মজের বাসভবন কলকাতায়।
রোহিনীবাবুর বহু অপ্রকাশিত প্রবন্ধ এবং বিছিন্নভাবে নানান পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ ও ক্ষেত্র সমীক্ষা ভিত্তিক লেখাগুলি যদি একত্রিত করে প্রকাশ করার উদ্যোগ রাজ্য সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ বা বড় কোনো উদ্যোগী মানুষেরা এগিয়ে আসেন তাহলে রোহিনীবাবু সত্যিকারের সম্মানিত হবেন ও নিজেরাও উপকৃত হবেন, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।
আলোর পথযাত্রী রোহিণীনাথ মঙ্গল







