এই মুহূর্তে ক্রীড়া/অনুষ্ঠান অন্যান্য সাহিত্য সম্পাদকীয় নোটিশবোর্ড

E-Paper

গুরুদেব, আচার্য, মাস্টারমশাই, মাস্টার, স্যার, শিক্ষকমহাশয়; আজও প্রাসঙ্গিক —সোমেশ চক্রবর্তী

Published on: September 8, 2026 । 8:52 AM

‘গুরুদেব, আচার্য, মাস্টারমশাই, মাস্টার, স্যার, শিক্ষকমহাশয়; আজও প্রাসঙ্গিক’
—সোমেশ চক্রবর্তী
চলমান, বহমান, খরস্রোতা, কখনও গতিময়, কখনও স্বকীয়তায় পরিপূর্ণ। শ্রদ্ধা, সম্মান, আশীর্বাদ প্রদান এবং শুভেচ্ছা বিনিময়ের যে অবিনশ্বর সেতুবন্ধন, শিক্ষক তারই এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি।
শিক্ষক মানে কেবল একটি পেশাগত পরিচয় নয়, শিক্ষক মানে আমরা, আমাদের দায়িত্ব, আমাদের আদর্শ, আমাদের নৈতিক অঙ্গীকার। শ্রদ্ধা ও সম্মান যে কোনও লহমায় মহাপ্রলয়ের সম্মুখীন হতে পারে, অথচ শিক্ষকতার পবিত্রতা তখনও অমলিন রাখার দায় আমাদেরই। কারণ যাঁরা নিষ্পাপ কাদামাটির মতো কোমল, সম্ভাবনাময় কিশলয়দের হাতে ধরে লালন করেন, স্নেহে, ভালোবাসায়, বাৎসল্যে তাঁদের হৃদয়কুসুমকে প্রস্ফুটিত করেন, নীতিশিক্ষা ও মূল্যবোধের আলো নিজের মধ্যে ধারণ করে পড়ুয়া ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তা সঞ্চারিত করার মহান ব্রতে যাঁরা আসীন, তাঁরাই শিক্ষক।
নিজস্ব আচরণ, গতিবিধি, কথাবার্তা, সামাজিকতা ও নৈতিকতার মধ্য দিয়ে বর্তমানকে সুস্পষ্টভাবে অবলোকন করে, ভবিষ্যতের জন্য বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী মানুষটিও শিক্ষক। প্রতিষ্ঠানে আগত কাদামাটির মতো নিষ্পাপ, পারিজাতের মতো সম্ভাবনাময় পড়ুয়ারা একদিন জৈবিক বয়সে বড় হয়ে যায়। পথিমধ্যে হঠাৎ সাক্ষাৎ হলে যখন তারা বলে, “স্যার, কেমন আছেন?”, কথাটি শুনতে সত্যিই ভালো লাগে।
আবার এই ঘুণধরা সমাজব্যবস্থার মধ্যেই যখন সেই ছাত্রছাত্রীরাই সকলের সামনে প্রণতি নিবেদন করে, তখন অজান্তেই বুকের ভিতর এক অদৃশ্য গর্বের প্রদীপ জ্বলে ওঠে। কারণ, তাদের বেড়ে ওঠার যাত্রাপথে আমরাও তো কোথাও না কোথাও নীরবে উপস্থিত ছিলাম। শিখেছি যা কিছু, পেয়েছি যা কিছু, শিখছি যা কিছু, নিজের সামর্থ্যের যতটুকু সঞ্চয় আছে, ততটুকুই পরবর্তী প্রজন্মকে দিয়ে যাওয়ার মানসিকতা যাঁদের, তাঁরাই শিক্ষক।
“ঐ যে গগনভেদী শিশুকলরব”— তার মধ্যে ছড়ির ভয় নয়, বরং কখনও কখনও শিক্ষকের সেই গভীর নীরবতাও থাকে, যে নীরবতা শাসনের চেয়ে অনেক বেশি কথা বলে। কারণ সত্যিকারের শিক্ষক জানেন, ছড়ি দিয়ে আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু ভালোবাসা দিয়েই হৃদয়কে গড়ে তোলা যায়। সবচেয়ে সংবেদনশীল কোনও প্রকল্পকে দিনের পর দিন কাঁধে বহন করতে করতে যখন ক্লান্তি এসে ফিসফিস করে বলে, “ক্লান্তি, আমায় ক্ষমা করো প্রভু”, তখনও আমরা থেমে যাই না। কারণ দায়িত্বের কাছে ব্যক্তিগত ক্লান্তিরও যেন কোনও আলাদা ভাষা নেই। সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য, সর্বাধিক মান্যতা গ্রহণকারী এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার অন্যতম প্রধান আধারও আমরা শিক্ষকরা। অভিভাবক ও এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে সুসম্পর্কের এক সুস্থ বাতাবরণ নির্মাণ করে প্রতিষ্ঠানকে অগ্রদূতের আসনে প্রতিষ্ঠিত করার মহান দায়িত্বও আমাদের কাঁধেই ন্যস্ত।
যে কোনও সময়, যে কোনও প্রয়োজনে বিভিন্ন প্রামাণ্য নথি প্রস্তুত ও প্রদান থেকে শুরু করে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার অসংখ্য দায়িত্বও আমাদেরই পালন করতে হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম আমরা একই ধারার সেতু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। আমাদেরই হাতে গড়ে ওঠা কেউ পুরস্কৃত হয়, কেউ ভবিষ্যতে সমাজের অন্য কোনও আলোচিত, প্রতিষ্ঠিত মানুষ হয়ে ওঠে। তাদের সাফল্যের গল্পে আমাদের নাম হয়তো লেখা থাকে না, কিন্তু তাদের নির্মাণের ইতিহাসে আমাদের নীরব অবদান থেকে যায়।
এই দোষ আমাদের নয়; এ আমাদের গর্ব।অবসর গ্রহণের পর প্রতিদিনই যেন ছুটির দিন। আর শোনা যায় না কিশলয়দের কলতান, করিডোরে ছুটে চলা পায়ের শব্দ, শ্রেণিকক্ষের সেই চেনা কোলাহল। অথচ কর্মজীবনে সেই কাজের মধ্যেই আমরা খুঁজি ছুটি, অপেক্ষা করি কখন ঘণ্টা বাজবে, কখন একটু অবকাশ মিলবে। অবসরের পরে বুঝতে পারি, যে কোলাহলকে একদিন ক্লান্তিকর মনে হয়েছিল, সেটিই ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে প্রাণময় সংগীত।
আমরা শিক্ষক। অবসর গ্রহণের পরও আমরা “স্যার”। বিদ্যালয়ে প্রবেশের সময় প্রণাম, বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আসার সময় ছুটির ঘণ্টাধ্বনিতে বিদ্যালয়কে এক অদৃশ্য প্রণাম, এই নিয়েই আমরা শিক্ষক। ছাত্রের হৃদয়জুড়ে নীরবে বিরাজমান থাকা, বহু বছর পরেও নিজের পরিচয় না দিয়েই ছাত্রের মুখে নিজের নাম শুনে ফেলা, এও তো শিক্ষকতার এক অনির্বচনীয় প্রাপ্তি। পথিমধ্যে ঘড়ির দিকে না তাকিয়েও অনেকে বুঝতে পারে, “কটা বাজল?”, কারণ দীর্ঘদিনের অভ্যাসে বিদ্যালয়ের ঘণ্টাধ্বনি, ক্লাসের সময়, টিফিনের অবকাশ, ছুটির মুহূর্ত, সবকিছুই আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে যায়।
তবে ব্যতিক্রম কখনও সর্বজনীন সত্য হতে পারে না। বিভিন্ন কারণে, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে, কোনও কোনও ভাবনায় অসম্মানিত হওয়ার অনুভূতিও শিক্ষকসমাজেরই হয়। সবাই বুনো রামনাথ নন, সবাই প্যারাবোলা স্যারও নন। তবুও আমরা আছি, থাকব, থাকতে হবে। কারণ শিক্ষকতা কেবল চাকরি নয়, এটি এক মহান পেশা, এক সুমহান ব্রত। ছড়ির ভয়ে নয়, ভালোবাসায়; শাসনের আতঙ্কে নয়, স্নেহের স্পর্শে আমরা কিশলয়দের মন ভরি, হৃদয় গড়ি। আজ যে শিশুটি আমাদের শ্রেণিকক্ষে বসে অক্ষর চিনছে, আগামীকাল সেই হয়তো বিজ্ঞানী হবে, কবি হবে, প্রশাসক হবে, শিল্পী হবে, কিংবা আবার শিক্ষক হয়ে আরেক প্রজন্মের হাত ধরবে।
এইভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জ্ঞানের প্রদীপ এক হাত থেকে অন্য হাতে পৌঁছে যায়। শত ন্যস্ত কাজের ভারেও অটল, অবিচল, নিরলস, আমরা শিক্ষক। আমাদেরই হাতে গড়ে ওঠে জাতির মূল্যবান সম্পদ। আমাদেরই হাতে নির্মিত হয় আগামী দিনের নাগরিক, আগামী দিনের সমাজ, আগামী দিনের স্বপ্ন। তাই শিক্ষক দিবসে শুধু শিক্ষককে ফুল দিলে হবে না; তাঁর আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ তার শ্রেণিকক্ষেই নীরবে লেখা হয়। বিদ্যালয়ের ঘণ্টা থেমে যায়, ক্লাস শেষ হয়, বই বন্ধ হয়, শিক্ষক অবসর নেন; কিন্তু একজন সত্যিকারের শিক্ষকের প্রভাবের কোনও অবসর নেই।
আমরা শিক্ষক। ছিলাম, আছি, থাকব। কিশলয়ের কলতানে, ছাত্রের সাফল্যে, প্রজন্মের অগ্রযাত্রায়, সমাজের বিবেকে , আমরা শিক্ষক।শিক্ষক আছেন বলেই তো সমাজ এখনও এত সুন্দর, তাই না?

কেয়া মণ্ডল চৌধুরী

আমার শিকড় ঘাটালে, আর আমার লেখার মূল বিষয় এখানকার সাধারণ মানুষ। তাঁদের জীবনের না-বলা কথাগুলো সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমার প্রধান লক্ষ্য। আপনার আশেপাশে ঘটে যাওয়া এলাকার যেকোনো খবর জানাতে সরাসরি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করুন ৮৯০০০২০০০১ নম্বরে।