কাজলকান্তি কর্মকার, ঘাটাল: আগে দাঙ্গা, বিক্ষোভ, অবরোধ বা ভাঙচুরে সম্পত্তির ক্ষতি হলে সাধারণ মানুষের সামনে ফৌজদারি মামলা করা ছাড়া আর কোনও পথ খোলা ছিল না। সেই আইনি প্রক্রিয়া শেষ হতে দশকের পর দশক সময় লেগে যেত এবং ক্ষতিপূরণ মেলারও কোনও নিশ্চয়তা ছিল না। কিন্তু এবার এই দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটতে চলেছে। ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকদের ক্ষতিপূরণের দাবি জানাতে আর সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে না। রাজ্যে নতুন আসছে West Bengal Maintenance of Public Order Amendment Bill, 2026. নতুন আইনের মাধ্যমে রাজ্য সরকার এবার নাগরিকদের হাতে সরাসরি ক্ষতিপূরণ আদায়ের নতুন হাতিয়ার তুলে দিচ্ছে। এখন থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা সংস্থা সরাসরি ‘ক্লেমস কমিশন’-এর দ্বারস্থ হতে পারবেন।
এই ক্লেমস কমিশন মূলত একটি ছোটখাটো দেওয়ানি আদালতের মতোই কাজ করবে। তবে এর কাজের পরিধি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। শুধুমাত্র জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ, দাঙ্গা, বিক্ষোভ, অবরোধ বা ভাঙচুরের জেরে হওয়া সম্পত্তির ক্ষতির পরিমাপ স্থির করা এবং সেই অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ প্রদান করাই হবে এই কমিশনের একমাত্র কাজ। রাজ্য সরকার বিজ্ঞপ্তি জারি করে প্রয়োজন অনুযায়ী এক বা একাধিক এমন কমিশন গঠন করতে পারবে। কলকাতা, উত্তরবঙ্গ বা দক্ষিণবঙ্গের জন্য আলাদা কমিশন হতে পারে, এমনকি পরবর্তীতে জেলাভিত্তিক কমিশন গঠনেরও সম্ভাবনা রয়েছে। এই কমিশনের চেয়ারম্যান পদে বসবেন একজন অবসরপ্রাপ্ত ডিস্ট্রিক্ট জাজ। তাঁর নীচে কোনও পদমর্যাদার বিচারক এই পদে বসতে পারবেন না। পাশাপাশি, রাজ্য সরকার একজন ডেপুটি সেক্রেটারি পদমর্যাদার আধিকারিককে এই কমিশনের সঙ্গে যুক্ত করবে। ফলে কমিশনে বিচার বিভাগ এবং প্রশাসন, উভয় দিকের প্রতিনিধিত্বই বজায় থাকবে।
কমিশনে কোনও মামলা দায়ের হলে প্রথমেই খতিয়ে দেখা হবে অভিযোগটি সত্য নাকি ভিত্তিহীন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ক্ষতির ধরন এবং তার বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হবে। এরপর চিহ্নিত করা হবে দোষীদের এবং কার থেকে কতটা ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে, তা স্থির করবে কমিশন। প্রয়োজনে কমিশন স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারে অথবা একজন ক্লেমস কমিশনার নিয়োগ করতে পারে। ওই কমিশনার ঘটনাস্থলে গিয়ে ক্ষতির হিসাব এবং দোষীদের চিহ্নিত করে কমিশনকে রিপোর্ট দেবেন। সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা বহুতল ভবনের মতো বড় মাপের ক্ষতির ক্ষেত্রে কমিশন চাইলে ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট, ভ্যালুয়ার বা সরকারি টেকনোক্র্যাটদের মতো বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিতে পারবে।
আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে তদন্ত প্রক্রিয়াকে আরও মজবুত করতে কমিশন সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ভিডিও, সংবাদমাধ্যমের ভিডিও, ড্রোন ফুটেজ, ডিজিটাল রেকর্ড সহ যাবতীয় বৈদ্যুতিন তথ্য প্রমাণ হিসেবে সংগ্রহ করতে পারবে। অর্থাৎ, শুধুমাত্র প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের উপর নির্ভরশীল থাকতে হবে না। ন্যাচারাল জাস্টিস বা স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের নীতি মেনে অভিযুক্তকেও আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দেওয়া হবে। অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘসূত্রিতা এড়াতে সামারি প্রসিডিওর ব্যবহার করে দ্রুত মামলার নিষ্পত্তি করবে কমিশন। সাধারণত ৩০ দিনের মধ্যে কমিশনকে রিপোর্ট জমা দিতে হবে, তবে বিশেষ প্রয়োজনে সময়সীমা কিছুটা বাড়ানো হতে পারে। সাক্ষীদের ডাকা, শপথ গ্রহণ, নথি তলব বা কমিশন জারি করার মতো সিভিল কোর্টের সমস্ত ক্ষমতাই এই ক্লেমস কমিশনের হাতে থাকবে। ফলে তদন্তে অসহযোগিতা করলে কড়া আইনি পদক্ষেপের মুখে পড়তে হবে। আবেদন করার পদ্ধতি এবং ফি সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য রাজ্য সরকার খুব শীঘ্রই সরকারি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে জানিয়ে দেবে।
দাঙ্গা বা অবরোধে সম্পত্তির ক্ষতি হলে এবার দ্রুত ক্ষতিপূরণ, নাগরিকদের সুবিধার্থে রাজ্যে গঠিত হচ্ছে ‘ক্লেমস কমিশন’







