এই মুহূর্তে ক্রীড়া/অনুষ্ঠান অন্যান্য সাহিত্য সম্পাদকীয় নোটিশবোর্ড

E-Paper

‘শহিদ ক্ষুদিরাম—দেশের যুবসমাজের চিরন্তন আইকন’—রাজীব মহাপাত্র

Published on: August 11, 2026 । 2:48 PM

স্বাধীনতার স্বপ্ন, শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এক অমর প্রেরণা ক্ষুদিরাম বসু।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস শুধু বড় বড় নেতার ইতিহাস নয়; এই ইতিহাস গড়ে উঠেছে অসংখ্য তরুণ-তরুণীর আত্মত্যাগ, কারাবরণ, নির্যাতন এবং মৃত্যুবরণের মধ্য দিয়ে। সেই ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র শহীদ ক্ষুদিরাম বসু। মাত্র আঠারো বছর বয়সে ফাঁসির মঞ্চে উঠে তিনি প্রমাণ করেছিলেন—বয়স নয়, মানুষের আদর্শ, সাহস এবং আত্মত্যাগই ইতিহাসকে বদলে দিতে পারে।
ক্ষুদিরাম আজও বাংলার যুবসমাজের কাছে শুধু একজন বিপ্লবী নন; তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চেতনার প্রতীক। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দেশপ্রেম মানে শুধু দেশকে ভালোবাসা নয়, দেশের মানুষের দুঃখ, দারিদ্র্য, শোষণ ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।ঔপনিবেশিক ভারতের বাস্তবতা
ক্ষুদিরামের বেড়ে ওঠার সময় ভারত ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে। রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাবের পাশাপাশি কৃষক, শ্রমজীবী এবং সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক শোষণ ছিল তীব্র। ব্রিটিশ শাসনের স্বার্থে ভারতীয় সম্পদ বিদেশে চলে যেত, কৃষির ওপর করের বোঝা বাড়ত এবং প্রশাসন সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অধিকারকে সীমিত রাখত।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত বাংলার মানুষের মধ্যে প্রবল ক্ষোভ সৃষ্টি করে। শুরু হয় স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলন। ছাত্র-যুবকদের একটি বড় অংশ এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়। সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিবেশেই ক্ষুদিরামের মতো তরুণদের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
কৈশোরেই প্রতিবাদের পথে
ক্ষুদিরাম বসুর জন্ম ৩ ডিসেম্বর ১৮৮৯ সালে মেদিনীপুর জেলার মোহবনি , হাবিবপুরে। অল্প বয়সেই তিনি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত হন।
তখনকার বিপ্লবী সংগঠনগুলি তরুণদের মধ্যে আত্মত্যাগ, শৃঙ্খলা এবং ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের চেতনা গড়ে তুলছিল। ক্ষুদিরামও সেই ধারার সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি স্বদেশি প্রচার, বিপ্লবী কর্মকাণ্ড এবং ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক প্রচেষ্টায় অংশ নেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—তৎকালীন বিপ্লবী আন্দোলনের রাজনৈতিক কৌশল এবং পরবর্তী কালের শ্রমিক-কৃষকভিত্তিক কমিউনিস্ট আন্দোলন এক জিনিস ছিল না। কিন্তু উভয়ের মধ্যেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগসূত্র।
কিংসফোর্ডের বিরুদ্ধে অভিযান
ব্রিটিশ বিচারক ডগলাস কিংসফোর্ড বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে কঠোর দমননীতির জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁকে লক্ষ্য করে বিপ্লবী সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
১৯০৮ সালে ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকীকে মুজফ্ফরপুরে পাঠানো হয়। তাঁদের লক্ষ্য ছিল কিংসফোর্ডকে আক্রমণ করা।
৩০ এপ্রিল ১৯০৮ রাতে মুজফ্ফরপুরে একটি গাড়িকে কিংসফোর্ডের গাড়ি মনে করে বোমা নিক্ষেপ করা হয়। কিন্তু গাড়িটিতে কিংসফোর্ড ছিলেন না; নিহত হন ইউরোপীয় মহিলা প্রিঙ্গল কেনেডি ও তাঁর কন্যা।
ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। বিপ্লবীদের উদ্দেশ্য ছিল কিংসফোর্ডকে লক্ষ্য করা, কিন্তু ভুল পরিচয়ের কারণে নিরপরাধ মানুষ নিহত হন।
গ্রেফতার ও বিচারবোমা নিক্ষেপের পর ক্ষুদিরাম পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। অবশেষে ১ মে ১৯০৮ তিনি ওয়াইনি রেলস্টেশনের কাছে ধরা পড়েন।
অন্যদিকে প্রফুল্ল চাকী পুলিশের হাতে ধরা পড়ার আগে আত্মহননের পথ বেছে নেন।
ক্ষুদিরামের বিরুদ্ধে মামলা শুরু হয়। বিচার প্রক্রিয়ায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
তিনি তখনও কিশোর থেকে সদ্য যৌবনে পা দেওয়া এক তরুণ।১১ আগস্ট ১৯০৮, মুজফ্ফরপুর জেলে ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি কার্যকর হয়।তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর ৮ মাসের কাছাকাছি।এত অল্প বয়সে মৃত্যুকে সামনে রেখে তাঁর অবিচল মনোভাব তাঁকে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অমর করে দেয়।
কেন ক্ষুদিরাম আজও যুবসমাজের আইকন?
ক্ষুদিরামের জনপ্রিয়তার মূল কারণ তাঁর বয়স নয়; তাঁর মধ্যে যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস ছিল, সেটিই তাঁকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।আজকের যুবসমাজ যখন বেকারত্ব, শিক্ষার ব্যয়, বৈষম্য, সামাজিক অন্যায়, শ্রমের অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের মুখোমুখি হয়, তখন ক্ষুদিরামের জীবন থেকে একটি শিক্ষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—
অন্যায়কে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা।এই কারণেই ক্ষুদিরামকে কেবল অতীতের বিপ্লবী হিসেবে দেখলে তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে ছোট করা হয়।বামপন্থী দৃষ্টিতে ক্ষুদিরামের উত্তরাধিকারবামপন্থী রাজনৈতিক ইতিহাসের দৃষ্টিতে স্বাধীনতা সংগ্রামকে কেবল ক্ষমতার হস্তান্তরের ইতিহাস হিসেবে দেখা হয় না। স্বাধীনতার অর্থ ছিল মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির প্রশ্নও।
পরবর্তী সময়ে ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলন শ্রমিক-কৃষক ও নিপীড়িত মানুষের অধিকারকে স্বাধীনতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে। ১৯২০ সালে কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক পরিসরে ভারতীয় কমিউনিস্টদের সংগঠিত হওয়া এবং ১৯২৫ সালে কানপুরে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা স্বাধীনতা সংগ্রামের রাজনৈতিক পরিসরে নতুন মাত্রা যোগ করে।ক্ষুদিরাম অবশ্য এই পরবর্তী কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না—কারণ তাঁর মৃত্যুর বহু পরে ভারতে সংগঠিত কমিউনিস্ট আন্দোলন শক্তিশালী হয়। কিন্তু তাঁর আত্মত্যাগ যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করেছিল, পরবর্তী শ্রমিক-কৃষকভিত্তিক আন্দোলন সেই স্বাধীনতার ধারণাকে আরও বিস্তৃত সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করে।
অর্থাৎ ক্ষুদিরামের উত্তরাধিকারকে আমরা একটি ঐতিহাসিক ধারার অংশ হিসেবে দেখতে পারি—ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকে মানুষের সামাজিক-অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম পর্যন্ত।
দেশপ্রেমের অর্থ শুধু আবেগ নয়
ক্ষুদিরামের নাম উচ্চারণ করে যদি শুধু আবেগ তৈরি হয়, কিন্তু সমাজের অন্যায়, বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে কোনো প্রশ্ন না ওঠে, তাহলে তাঁর জীবন থেকে আমরা অর্ধেক শিক্ষা গ্রহণ করি।
দেশপ্রেমের প্রকৃত অর্থ হতে পারে—
দেশের প্রতিটি মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা;
শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির পক্ষে দাঁড়ানো;
কৃষকের অধিকার রক্ষা করা;
শিক্ষাকে সবার নাগালের মধ্যে আনা;
বেকার যুবকের কাজের অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া;
ধর্ম, জাতপাত ও পরিচয়ের নামে বিভাজনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো;
নারী ও প্রান্তিক মানুষের সমানাধিকারের পক্ষে থাকা;
গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
এই অর্থে ক্ষুদিরামের দেশপ্রেম কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; তা বর্তমানের সামাজিক দায়িত্বেরও প্রশ্ন।
যুবসমাজের কাছে ক্ষুদিরামের বার্তা
ক্ষুদিরামের জীবন আমাদের শেখায়, তারুণ্য শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য নয়—সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি করার সময়ও।
আজকের যুবসমাজের হাতে রয়েছে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও যোগাযোগের অভূতপূর্ব সুযোগ। সেই শক্তিকে যদি মানবকল্যাণের কাজে ব্যবহার করা যায়, তবে সেটিও এক ধরনের সামাজিক সংগ্রাম।
ক্ষুদিরাম হাতে অস্ত্র নিয়েছিলেন তাঁর সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে। আজকের তরুণদের সংগ্রামের অস্ত্র হতে পারে যুক্তি, শিক্ষা, বিজ্ঞান, গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ, সংগঠন এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহস।
সুতরাং ক্ষুদিরামকে অনুসরণ করার অর্থ তাঁর সময়ের প্রতিটি পদ্ধতিকে হুবহু অনুসরণ করা নয়; বরং তাঁর অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন মনোভাব, আত্মত্যাগ, সাহস এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে বর্তমান সময়ের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করা।
ক্ষুদিরাম—একটি নাম, এক অমর প্রতীক
মাত্র আঠারো বছরের এক তরুণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সামনে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে বরণ করেছিলেন। তাঁর জীবনের পরিসর ছিল ছোট, কিন্তু তাঁর আত্মত্যাগের অভিঘাত ছিল সুদূরপ্রসারী।
ক্ষুদিরামের ফাঁসি শুধু একজন তরুণ বিপ্লবীর মৃত্যু ছিল না; তা বাংলার যুবসমাজের কল্পনায় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে আরও তীব্র করে তুলেছিল।
তাই আজও যখন তাঁর নাম উচ্চারিত হয়, তখন শুধু একটি ঐতিহাসিক চরিত্রের কথা মনে পড়ে না—মনে পড়ে প্রশ্ন করার সাহস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস এবং মানুষের মুক্তির স্বপ্ন।
ক্ষুদিরাম আমাদের ইতিহাসের শহীদ।
তিনি আমাদের তারুণ্যের প্রতীক।
তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক।
তিনি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
আর তাই শতবর্ষ পেরিয়েও তিনি বাংলার যুবসমাজের কাছে প্রাসঙ্গিক—
ক্ষুদিরাম কোনো অতীতের ছবি নন; তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা তারুণ্যের চিরন্তন প্রতীক।
শহীদ ক্ষুদিরাম অমর থাকুন।
স্বাধীনতার স্বপ্ন অমর থাকুক।
মানুষের মুক্তির সংগ্রাম অমর থাকুক।

 

কেয়া মণ্ডল চৌধুরী

আমার শিকড় ঘাটালে, আর আমার লেখার মূল বিষয় এখানকার সাধারণ মানুষ। তাঁদের জীবনের না-বলা কথাগুলো সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমার প্রধান লক্ষ্য। আপনার আশেপাশে ঘটে যাওয়া এলাকার যেকোনো খবর জানাতে সরাসরি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করুন ৮৯০০০২০০০১ নম্বরে।