জগন্নাথ রায়, স্থানীয় সংবাদ, ঘাটাল: ভাবতে অবাক লাগে আজ থেকে মাত্র ত্রিশ বছর আগে, ডিজিটাল সংযোগ ছিল মাত্র কয়েক মিলিয়ন মানুষের কাছে কিন্তু আজ ডিজিটাল বিপ্লব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় পাঁচ বিলিয়ন মানুষের কাছে ডিজিটাল সংযোগ রয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশ রয়েছে যেখানে শিশু ও অল্প বয়সী কিশোর কিশোরীদের মধ্যেও ডিজিটাল সংযোগের হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের কাছে ইন্টারনেট এখন আর বিলাসিতা নয় এটি একটি নিত্য প্রয়োজনীয় অপরিহার্য বিষয় হয়ে উঠেছে। তাই তো তারা এখন খেলাধুলা, বন্ধু-বান্ধবের সাথে যোগাযোগ রাখা, অজানা বিষয়কে জানা ও বিষয় কেন্দ্রিক দক্ষতা অর্জন সহ আরো বহুবিধ বিষয়ে পারদর্শী হয়ে উঠতে মাত্রাতিরিক্ত ইন্টারনেট নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। সেইসঙ্গে বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence) ব্যবহার ডিজিটাল বিপ্লবকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানার্জন থেকে শুরু বিভিন্ন প্রকল্প রূপায়ণ ও গবেষণাপত্র প্রস্তুতিকরণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ অনস্বীকার্য। বর্তমান বিশ্বে স্কুলগামী শিশুদের আনুমানিক এক – তৃতীয়াংশ শিশু ও কিশোর-কিশোরী দের মধ্যে ইন্টারনেট আসক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ তাদেরকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছে, যা তাদের শিখন দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যকেও বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করছে।
ডিজিটাল বিশ্বে শিশুর শিক্ষা:-
ইন্টারনেটের ব্যবহার হল বর্তমান শিক্ষার একটি আধুনিকতম সংযোজন। তাই ইহাকে বাদ দিয়ে আধুনিক শিক্ষা কোনভাবেই সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীর শিশু মনের সর্বাধিক বিকাশের লক্ষ্যে ও শিশুকে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর পেশাদারী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হলে ইন্টারনেট ব্যবহার এর বিকল্প আর দ্বিতীয়টি নেই। আমাদের দেশ ভারতবর্ষ বর্তমান বিশ্বের দ্রুততম উন্নয়নশীল দেশ। আর দেশের উন্নয়নের এই ধারাকে আরো ত্বরান্বিত করতে হলে আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ তথা ছাত্রযুব সমাজকে চিরাচরিত শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে মুক্ত করে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর কারিগরি জ্ঞান বিশেষজ্ঞ পেশাদারী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে, আর এই উদ্দেশ্য কেবলমাত্র পূরণ করতে পারে একমাত্র আধুনিক ডিজিটাল নির্ভর শিক্ষা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ও পাঠ্যক্রম বহির্ভূত কার্যকলাপ উভয় ক্ষেত্রেই ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষার্থীর শিখন দক্ষতাকে বাড়িয়ে তাদের জ্ঞান ভান্ডার কে সমৃদ্ধশালী করে তোলে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ এখনো সেভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে উঠতে পারেনি, যেখানে বিশ্বের উন্নত দেশগুলির শিক্ষা ব্যবস্থায় এই ধরনের শিক্ষার প্রয়োগ বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। তাই বর্তমান সরকারকে সর্বপ্রথম দেশের সমস্ত বিদ্যালয় গুলিতে বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল অবকাঠামর উন্নয়ন করতে হবে এবং সেই সঙ্গে স্কুল থেকেই পাঠ্যক্রমে ডিজিটাল শিখন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
ডিজিটাল বিশ্বে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য:-
শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি ইন্টারনেট ব্যবহারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সর্বপ্রথম ব্যবহৃত প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা সুনিশ্চিতকরণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্ষতিকর বিষয়গুলি মোকাবিলা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের শিশু অধিকার কমিটি শিশু অধিকার সংস্থাগুলোকে সতর্ক করেছে যে অনলাইনে শিশুর ক্ষতিকর বিষয়বস্তু, গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং বাণিজ্যিক শোষণের শিকার প্রভৃতি বিষয়গুলোকে সুরক্ষিত করতে। আমাদের দেশ শিশুর মানসিক স্বার্থ রক্ষার্থে একাধিক আইনি ও নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যেমন, অনলাইনে উগ্র যৌন প্রদর্শন, উৎপীড়ন ও নির্যাতন, সাইবার ক্রাইম, গেম ও বিভিন্ন মনোরঞ্জক ভিডিও এর মাধ্যমে আর্থিক প্রতারণা, সমাজ মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক, ধর্মীয় ও কৃষ্টি মূলক ভাবাবেগে আঘাত ও উস্কানিমূলক ভাষণ, এই সমস্ত বিষয়গুলিকে সরকারের বিভাগীয় দপ্তর নিরন্তন পর্যবেক্ষণের আওতায় রেখেছেন। যদিও বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে গৃহীত ব্যবস্থা গুলো অপর্যাপ্ত তাইতো শিশুরা আজ লক্ষ্যহীন দিশাহীন পথভ্রষ্ট। আর এই সমস্যা আমাদের দেশ ভারত সহ তৃতীয় বিশ্বের দেশ গুলিতে মারাত্মকভাবে ক্রমাগত প্রকট হয়ে উঠছে।
সমাজ মাধ্যম ও আজকের ছাত্র যুব সমাজ:-
বর্তমানে জেন- জি দের কাছে আজ সবচেয়ে জনপ্রিয় হল সমাজ মাধ্যম। তাদের অনলাইনে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। বর্তমান প্রজন্মের অল্পবয়সী ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৩৫ ঘন্টা সোশ্যাল মিডিয়া ব্রাউজ ও যোগাযোগে ব্যয় করে, যা তাদের বাড়ির কাজ ও স্কুলের পড়াশোনায় ব্যয় করা সময়ের চেয়েও বেশি। সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় ব্যয় করায় একদিকে যেমন তাদের মুখ্য কাজ অর্থাৎ পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি অন্যদিকে নিজের শরীর নিয়ে হীনমন্যতা, মানসিক অবসাদ ও খেলাধুলা বিমুখ প্রভৃতি সমস্যাগুলো ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায় যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গুলো শিশুর জ্ঞান ও দক্ষতা বিকাশে অসাধারণ সুযোগ ক্রমাগত বৃদ্ধি করে চলেছে। আর বর্তমানে সর্বাধিক চর্চিত বিষয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ, যা আমাদের জীবনযাত্রাকে সর্বক্ষেত্রে সহজ সরল ও সুবিধাজনক করে তুলেছে। তাই ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারকে বাদ দিয়ে কোনভাবেই আধুনিক শিক্ষা সম্ভব না। বিভিন্ন রকমের সমস্যা থাকা সত্ত্বেও শিশুকে একেবারে ডিজিটাল শিক্ষা থেকে বিরত না করে সুনিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পনামাফিক ডিজিটাল শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। যেমন দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের স্ক্রিন থেকে দূরে রাখা এবং দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সীদের জন্য দৈনিক এক ঘন্টার ও কম সময় নিশ্চিত করা। খাওয়ার সময় ও ঘুমোতে যাওয়ার এক ঘন্টা আগে স্ক্রিন থেকে দূরে রাখা। সবশেষে বলা যায় শিশুর মধ্যে কোন খারাপ প্রভাব বা খারাপ অভ্যাস সৃষ্টি হতে পারে এমন স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল প্ল্যাটফর্ম গুলি থেকে দূরে রেখে কেবলমাত্র তাদের শিখন সহায়ক, মন ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপযোগী বিষয়গুলিকে শুধু নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মধ্য দিয়ে একটি শিশুর সর্বাঙ্গিক বিকাশ ঘটাতে পারলে এই ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার শিশুর কাছে আশীর্বাদ স্বরূপ হয়ে উঠবে।
[লেখক একজন ভূগোলের শিক্ষক, হেড়োভাঙ্গা বিদ্যাসাগর বিদ্যামন্দির, ঝাড়খালী, দক্ষিণ ২৪ পরগণা | এবং দাসপুর-২ ব্লকের আজুড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা]









