আমরা তাঁকে কেউই মনে রাখি না, জানেন কি আজ ঘাটালের গর্ব বিপ্লবী প্রভাংশু শেখর পালের জন্মদিন?
সুমন বিশ্বাস[WBCS], প্রাক্তন মহকুমা শাসক, ঘাটাল মহকুমা: আজ ১৫ জুলাই। বিপ্লবী প্রভাংশুশেখর পালের জন্মদিন। ১৯১৩ সালের আজকের দিনে দাসপুর থানার খানজাপুর গ্রামে তিনি
জন্মগ্রহণ করেছিলেন।তিনি ছিলেন একজন ভারতীয় বিপ্লবী এবং বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের সদস্য , যিনি ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের প্রচেষ্টায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গুপ্তহত্যা চালিয়েছিলেন।
এবার আসি তাঁর শৈশব জীবনে। প্রভাংশু শেখর পাল ১৯১৩ সালে একটি মাহিষ্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর পিতার নাম ছিল ডাঃ আশুতোষ পাল এবং মায়ের নাম ছিল লক্ষ্মীমণি পাল। তাঁর বাবা একজন ডাক্তার এবং গবেষক ছিলেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল ঘাটালের দাসপুরের খাঞ্জাপুর গ্রামে। যে গ্রামের রথযাত্রা বর্তমানে বিখ্যাত হয়েছে। শৈশবে তাঁকে মেদিনীপুরে তাঁর মামার বাড়িতে পাঠানো হয়, যেখানে তিনি বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তের হাত ধরে ব্রিটিশ ভারতের একটি বিপ্লবী সংগঠন বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সে যোগ দেন । প্রভাংশু শেখর পালের কাকা ইঞ্জিনিয়ার প্রশান্ত কুমার পাল সেই আমলে খাঞ্জাপুরে একটি সূর্যঘড়ি বানিয়েছিলেন যেটি আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে। আপনি চাইলে সেই ঘড়িটি দেখে আসতে পারেন।
প্রভাংশু পারলের বিপ্লবী কার্যকলাপে দু’চার কথা বলতে গেলে ডগলাসকে হত্যার বিষয়টি তুলে ধরতে হয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জেমস পেডির হত্যার পর , রবার্ট ডগলাস নামে একজন নিষ্ঠুর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে মেদিনীপুর জেলায় বদলি করা হয়। বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের বিপ্লবীরা ডগলাসকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয় কারণ তিনি হিজলি ডিটেনশন ক্যাম্পে দুজন নিরস্ত্র বন্দী তারকেশ্বর সেনগুপ্ত এবং সন্তোষ মিত্রকে হত্যার জন্য দায়ী ছিলেন । ১৯৩২ সালের ৩০ এপ্রিল, প্রভাংশু শেখর পাল এবং প্রদ্যোত কুমার ভট্টাচার্য ম্যাজিস্ট্রেটের উপর গুলি চালান যখন তিনি জেলা বোর্ডের বর্তমানে যেটি জেলা পরিষদ ভবন সেখানে একটি সভায় সভাপতিত্ব করছিলেন। সেদিন প্রদ্যোত ভট্টাচার্যের বন্দুক থেকে গুলি বের হয়নি কারণ বন্দুকটি খারাপ ছিল। প্রভাংশু শেখর পালের গুলিতেই ডগলাস নিহত হন। প্রভাংশু শেখর পাল পালিয়ে গেলেও প্রদ্যোৎ ভট্টাচার্যকে ঘটনাস্থলেই রিভলভারসহ ধরা হয়। পুলিশের প্রচণ্ড নির্যাতন সত্ত্বেও প্রদ্যোত ভট্টাচার্য তার কোনো সহযোগীর নাম প্রকাশ করেননি। ম্যাজিস্ট্রেট পেডি এবং ডগলাসের হত্যার পর, বার্নার্ড ই. জে. বার্জ নামে আরেকজন নিষ্ঠুর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে মেদিনীপুরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের সদস্যরা তাকেও হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রভাংশু শেখর পাল বার্জকে হত্যার জন্য অস্ত্র সংগ্রহ করতে বিভি সদস্যদের সাহায্য করেছিলেন। ১৯৩৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর পুলিশ প্যারেড গ্রাউন্ডে একটি ফুটবল ম্যাচের বিরতির সময় অনাথ বন্ধু পাঞ্জা এবং মৃগেন্দ্রনাথ দত্তের গুলিতে বার্জ নিহত হন । পর পর তিন বছরে তিনজন জেলা শাসকের হত্যার ঘটনায় কেঁপে উঠেছিল ভারতবর্ষ। মেদিনীপুরই ছিল একমাত্র জেলা যেখান থেকে সূচিত হয়েছিল ভারতের স্বাধীনতার বীজমন্ত্র। প্রসঙ্গত বলে রাখি, পেডি এবং ডগলাস দুজনেই খুন হয়েছিলেন এপ্রিল মাসে। এপ্রিল এলেই তাই আতঙ্কে ভুগতেন জেলা শাসকরা, এই আতঙ্কের নাম ছিল ‘এপ্রিল আতঙ্ক’ । এই সময়গুলিতে তাঁরা বাংলো থেকেও বেরোতেন না খুব একটা।
কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর প্রভাংশু শেখর পাল ১৯৪১ সালে ব্যাচেলর অফ কমার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। জীবনের বাকি সময় তিনি একজন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭২ সালের আগস্ট মাসে ভারত সরকার তাকে তাম্রপত্র দিয়ে সম্মানিত করে। প্রভাংশু শেখর পাল ২০০৭ সালের ২ জুন মারা যান। কিন্তু আক্ষেপের কথা, আমরা কেউই তাঁকে মনে রাখিনি। আজ তাঁর জন্মদিন কিন্তু আমরা কতজন জানি? বাংলা জুড়ে পালনের কথা বাদ দিলাম, তাঁর জন্মস্থান ঘাটাল মহকুমা কি তাঁকে মনে রেখেছে?






