কাজলকান্তি কর্মকার, ঘাটাল: ঘাটাল মহকুমা তথা অবিভক্ত মেদিনীপুরের আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষণার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র রোহিণীনাথ মঙ্গল আর নেই। শনিবার সকালে ৯০ বছর বয়সে তাঁর প্রয়াণের খবরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে ইতিহাস গবেষক, লেখক ও সংস্কৃতিমহলে। তাঁর মৃত্যুতে আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চার একটি যুগের অবসান ঘটল বলেই মনে করছেন গবেষকরা। দীর্ঘদিন ধরে ঘাটাল মহকুমার মধ্যযুগ থেকে একবিংশ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে নিরলস গবেষণা করেছেন রোহিণীনাথ মঙ্গল। তিনি শুধু তথ্য সংগ্রহই করেননি, স্থানীয় ইতিহাস অনুসন্ধানের একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতিরও দিশা দেখিয়েছেন। ইতিহাসের সত্যতা যাচাই করতে মাঠপর্যায়ে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ, নথিপত্র বিশ্লেষণ এবং স্থানীয় মানুষের স্মৃতিচারণকে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনুকরণীয়।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘জাড়া গোলক বৃন্দাবন’ এবং ‘বিদ্রোহী রাজা শোভা সিংহ’ আজও আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে ‘বিদ্রোহী রাজা শোভা সিংহ’ গ্রন্থে ইতিহাসের নানা অজানা দিক তুলে ধরেছেন তিনি। আবার বাংলা চলচ্চিত্র ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’-র নায়ক অ্যান্টনির বহু আগে জাড়ার জমিদার রায়বাড়ির আটচালায় কবিগানের আসরে অংশগ্রহণের ঐতিহাসিক তথ্য তুলে ধরে তিনি গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন।
সমসাময়িক গবেষকদের মতে, ঘাটাল মহকুমা ও মেদিনীপুর জেলার স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে বর্তমানে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের অনেকের কাছেই রোহিণীনাথ মঙ্গল ছিলেন প্রেরণার উৎস ও পথপ্রদর্শক। গবেষক দেবাশিস ভট্টাচার্য, সুকান্ত সিংহ, কেশব মেট্যা, গণেশ দাস, উমাশঙ্কর নিয়োগী-সহ বহু গবেষকের সঙ্গে তাঁর ছিল নিবিড় যোগাযোগ।
সহকর্মীদের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে তাঁর অত্যন্ত বিনয়ী ও নিরহংকারী ব্যক্তিত্বের কথা। নিজের গবেষণার গভীরতা কখনও প্রকাশ্যে তুলে ধরতেন না। নিভৃতে কাজ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। অসংখ্য গবেষণাধর্মী লেখা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছড়িয়ে রয়েছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ইতিহাস গবেষণায় মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে।
রোহিণীনাথ মঙ্গলের প্রয়াণে ঘাটাল মহকুমা শুধু একজন গবেষককেই হারাল না, হারাল আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চার এক নিবেদিতপ্রাণ অভিভাবককে। তাঁর গবেষণা, গ্রন্থ এবং চিন্তাধারা আগামী দিনেওইতিহাস অনুসন্ধানীদের পথ দেখাবে।






