কবি সুমন বিশ্বাসের পুজো নিয়ে কয়েকটি কবিতা

বানভাসি দুর্গা
শিলাবতীতে বন্যা এলো, তলিয়ে গেল পাড়া
বানভাসি সেই মানুষজন কেমন আছেন তারা?
জমির ফসল নষ্ট হল, ভাঙলো ঘর বাড়ি।
স্বজন হারানোর শোক ভুলতে কি আর পারি?
তবুও তো শরৎ আসে শিশির ঝরে ঘাসে।
কাশের শোভায় মেঘের ভেলায় মহামায়া আসে।
মা আসেন সন্তানদের সাহস দিতে মনে।
নব শক্তির প্রাণ সঞ্চার ছড়ায় ভূবনে।
মা আসেন ত্রান শিবিরে অন্নপূর্ণা হয়ে,
সন্তানরা কেমন আছেন জীবন জ্বালা সয়ে।
এলাকাবাসীর লড়াই আর মায়ের আশীর্বাদ
এই বছরে রক্ষা পেল প্রতাপুপুরের বাঁধ।
দুর্গতিনাশিনী মা আর দিও না বান
আর কেড়ো না অবলা এই সন্তানদের প্রাণ।
হৈমন্তী মা আমার ফসল দিও ঘরে
নৈবদ্য সাজাতে হবে পুজার থালার পরে।
আর ভেঙো না ঘরবাড়ি আর কেড়ো না প্রাণ
দশ হাতে মা সন্তানদের করো অভয় দান।

এ দুর্গা সে দুর্গা
এক দুর্গা তালিবানে অ্যাসিডে হারায় চোখ,
সেই দুর্গার স্বপ্নগুলো আজকে সফল হোক।
এক দুর্গা বোরখা পড়া, থাকে অন্তঃপুরে;
মুক্ত পাখি মেলুক ডানা তার হৃদয় জুড়ে।
চতুর্দশী হলো দুর্গা, ঠিক হল তার বিয়ে,
স্কুল ছেড়ে ধরল হেঁশেল শ্বশুড় বাড়ি গিয়ে।
এক দুর্গা কন্যা ভ্রূণেই পেটের মধ্যে খুন।
সদ্যজাত এক দুর্গার জুটল গলায় নুন।
এক দুর্গা লুট হয়ে যায় সাঁকোর পারে ঝোপে;
শেষ রাতে খুন হয় সে চপারের কোপে।
এক দুর্গা দিবারাত্র অত্যাচারের শিকার;
শ্বশুড় বাড়ির নির্যাতনে হারায় সব অধিকার।
এক দুর্গা রেড লাইটে, আগুনে পুড়ে খাঁটি।
শরীর বেঁচে পূণ্য করে বেশ্যা বাড়ির মাটি।
সেই দুর্গারা মালালা হোক, উঠুক জ্বলে আজ।
সেই দুর্গা ভুলিয়ে দিক এই সমাজের লাজ।
সেই দুর্গা তসলিমা হোক, হোক সানিয়া-সাইনা;
এই দুর্গাদের দুর্গতি আর সহ্য করা যায়না।
সে দুর্গারা মেধা পাটেকর, মন্দ্রাক্রান্তা সেন;
সে দুর্গারা এদের জন্য কলম ধরেছেন।
এ দুর্গাদের রক্ষা করো; দিও বাঁচার শক্তি;
মাগো তোমায় করি পুজো দিয়ে শ্রদ্ধা-ভক্তি।

সবার দুর্গাপুজো
শৈশবের পুজো মানে ক্যাপ-বন্দুক-বাজি।
সোনালী সেই দিনগুলোতে ফিরে যেতে রাজী।
শৈশবের পুজো মানেই নতুন জামার গন্ধ,
ক’টা দিনের মুক্তির স্বাদ, বইয়ের ব্যাগটি বন্ধ।
বাবার মায়ের হাত ধরে ঠাকুর দেখার ধূম।
মনেপ্রাণে দেদার খুশি, চোখে নেইকো ঘুম।
মায়ের মেক-আপ বক্সে হয় মেয়ের হাতেখড়ি,
ধেবড়ে যাওয়া লিপস্টিকেও আহা মরি-মরি।
পুজো মানেই নতুন কিছু অন্য দিনের থেকে,
চারটে দিন অনেক কিছুই মনে দিয়ে যায় এঁকে।

শিশু থেকে কিশোর হলে ভিন্ন পুজোর স্বাদ।
কিশোর খোঁজে সদ্য হওয়া কোনো কিশোরীর হাত।
পুজো মানেই প্রথম শাড়ি, বন্ধুত্বের ছোঁয়া।
কৈশোরের হাতেখড়ি সিগারেটের ধোঁয়া।
পুজোতেই প্রথম শুরু বন্ধুদের ঠেক,
অন্যভাবে চলার শুরু, অন্যরকম ব্রেক।
কারণসুধার নবপরিচয় – হুইস্কির স্বাদ,
উড়ছে জীবন, পুড়ছে জীবন, কাটছে অবসাদ।
কিশোর-কিশোরী বাইক রাইড, পথচলা শুরু।
পাছে কেউ দেখে ফেলে তাই বক্ষ দুরুদুরু।
পুজো মানে মুক্তধারা, নতুন জীবন পাওয়া।
এই জন্যেই মাকে ডাকা, মায়ের কাছে যাওয়া।

মহাষ্টমীর অঞ্জলীতে মা-বোনেদের ভীড়।
মাগো তুমি রক্ষা কোরো সব শান্তির নীড়।
নববধুর সিঁদুর খেলা, জীবন হয় ধন্য।
সবার জন্য শারদীয়া তাই এত অনন্য।
মন্ডপেতে দেবীর পুজো, বাড়িতে পেটপুজো।
বউ-ঝি’রা তাই রান্নাঘরে খেটে হয় কুঁজো।
রকমারী সব রান্নাতে রসনা বলে জয়মা।
মাদুর্গা তুইই বল এসব ছাড়া হয় মা?

বুড়ো-বুড়ি ধুতি-শাড়ি, আড্ডা জমে ভারী।
দেখছে চেয়ে কচি-কাঁচা মারছে শুধুই ঝাড়ি।
বাড়িতে ফেরে পটলা-মদন বাইরে ছিল যত।
মন্ডপে তাই আড্ডা জমে সিগারেট পোড়ে কত।
সবার জন্যে মা আসে তাই সেই কৈলাশ থেকে।
মা দুর্গাও বেজায় খুশি এসব কান্ড দেখে।

পুজো এলো
আকাশ জূড়ে তুলতুলে মেঘ, কাশ ফূটেছে বনে,
জং ধরেছে ভক্তিতে আর রঙ ধরেছে মনে।
পূজো এলো পূজো এলো জয় দুর্গা বল,
ক্রেডিট কার্ডের সাহারাতে শপিং মলে চল।
দুর্গা এলো দুর্গা এলো বানভাসি শিবিরে
দুর্গা এলো দুর্গা এলো ধর্মতলার ভীড়ে।
পূজো এলো পূজো এলো বেশ্যা বাড়ীর মাটি,
নীল বাতির লাল আগুনে হচ্ছে পুড়ে খাঁটি।
পুজো এলো ফুটপাতে, পুজো এলো ফেসবুকে,
পুজো এলো বাংলায় সুখে আর অসুখে।
পুজো এলো, এলো জামা আর নতুন জুতো।
গরীব মানুষ বুঝল বেশি গরীব হওয়ার গুঁতো।
পুজো এলো ই-মেলে, পুজো এলো অর্কুট-এ।
বন্যায় বাঁধ ভেঙে মা এলো রং রুটে।
মজুরির সাথে বাড়ে জিনিসের দাম,
দিন এনে দিন খেয়ে ঝরে শুধু ঘাম,
সে ঘরেও পুজো এলো, বোনাস জোটেনি।
ছেলে মেয়ে মনমরা, হাসি কারো ফোটেনি।
মৃন্ময়ী মা হাসে, বানে ভাসে গোটা দেশ,
অসুরের কালো হাতে দেশ হয়ে গেল শেষ।
কেউ বাঁচে কালোসুখে, কেউ মরে না খেয়ে,
তবু আসে দেবীপক্ষ আগমনী গান গেয়ে।
পুজো আসে, পুজো যায়, এভাবেই কাটে দিন,
বন্যার্তদের আবেদন ধীরে ধীরে হয় ক্ষীণ।

ঘাটাল মহকুমার সমস্ত আপডেট তে যুক্ত হন আমাদের সাথে!

‘স্থানীয় সংবাদ’ •ঘাটাল •পশ্চিম মেদিনীপুর-৭২১২১২ •ইমেল: [email protected] •হোয়াটসঅ্যাপ: 9933998177/9732738015/9932953367/9647180572/9434243732 আমাদের এই নিউজ পোর্টালটি ছাড়াও ‘স্থানীয় সংবাদ’ নামে একটি সংবাদপত্র, MyGhatalমোবাইল অ্যাপ এবং https://www.youtube.com/SthaniyaSambad ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে।