সাপের কামড়ে আর মৃত্যু নয়, চিকিৎসা চাই গ্ৰামীণ হাসপাতালগুলিতে

সুব্রত বুড়াই [প্রধান শিক্ষক, গোমকপতা হাইস্কুল, দাসপুর-২ •মো:+91 97336 96916]:  সাপ নিরীহ প্রাণী, প্রায় ১২ কোটি ৮০ লক্ষ বছর আগে ওরা পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছে। উষ্ণ অঞ্চলে সাপেদের বেশি  [‘স্থানীয় সংবাদ’-এর সমস্ত কিছু জানতে এখানে ক্লিক করুন]দেখা যায়। ভারতে ২৭০ প্রজাতির সাপ রয়েছে আর পশ্চিমবঙ্গে সেই সংখ্যাটা ১০০’র মত। সাপেদের কোনও বহিঃ কান বা কানের পর্দা নেই। এরা কথাবার্তা বা সঙ্গীত কোনও কিছুই শুনতে পায় না। এদের শরীর অনুকম্পনে সাড়া দেয়। মানুষ এদের খাদ্য তালিকায় নেই, টিকটিকি, পাখি, মাছ, ডিম এবং ছোট ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীরা এদের প্রধান খাদ্য। সাপের বিষ মূলত ভারী প্রোটিন, উৎসেচক ও বিষাক্ত পদার্থের মিশ্রণ। যেমন মায়োটক্সিন, কার্ডিওট্রক্সিন ইত্যাদি। সাধারণত নিউরোটক্সিন বিষ স্নায়ুতন্ত্রে আঘাত করে এবং হেমাটোটক্সিন বিষ মানুষের রক্ত সংবহন তন্ত্রে আঘাত করে। গ্রীষ্মকাল ও বর্ষাকালে সাপে কামড়ানোর ঘটনা বেশি ঘটে। সাধারণত মানুষের অসচেতনতার ফলে সাপে কামড়ালেও মানুষ প্রথমে বুঝতে পারেন না।
সাপে কামড়ালে কী কী করবেন জেনে নিন— কৃষি জমিতে, মাঠ-ঘাটে এবং রাত্রিতে খুব সাবধানে চলাফেরা করা উচিত। যারা কৃষি জমিতে নিয়মিত যান তারা হাতে একটি লাঠি রাখবেন, সাপ দেখতে পেলে তাড়িয়ে দেবেন। সাপে কামড়ালে এক বিন্দু সময় নষ্ট না করে কাছাকাছি ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে যাবেন যেখানে এভিএস (পুরো নাম অ্যান্টিভেনম সিরাম) রয়েছে। একেবারেই গুণিন বা ওঝার কাছে রোগীকে নিয়ে যাবেন না। প্রাথমিক চিকিৎসার পর যদি ডাক্তারবাবু মনে করেন যে অন্য কোনও জায়গায় রোগীকে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে, তাহলে রোগীকে ডাক্তারবাবুর পরামর্শমতো সেখানে নিয়ে যাবেন। সাপে কামড়ালে রোগীর মনোবল বাড়াতে থাকবেন। ভয় পেতে দেবেন না। এইসময় ভয় পেলে রোগীর হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
কোন সাপ কামড়ালে কী কী লক্ষ্মণ দেখা দেবে জেনে নিন— ১০০ জন রোগীকে সাপে কামড়ালে ১০-১৫ জনের শরীরে বিষ ঢোকে। সাপের বিষের পরিমাণের উপর নির্ভর করে রোগীর সুস্থতা। মানুষের ওজনের সাথে কি পরিমাণ বিষ শরীরে প্রবেশ করেছে তার উপর মানুষের মৃত্যু নির্ভর করে। বেশিরভাগ সাপ বিষহীন। তাদের উত্তপ্ত না করলে তারা কামড়ায় না। অনেক সময় বিষবিহীন সাপ কামড়ালেও রোগী আতঙ্কেই মারা যান। গোখুরো, কেউটে এবং চন্দ্রবোড়ার কামড়ে বেশি সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হতে দেখা গিয়েছে। এই সাপগুলি কামড়ালে যা যা উপসর্গ দেখা যায়— যেমন প্রচণ্ড ব্যথা, ক্রমবর্ধমান ঝিমিয়ে আসা, চোখের দু’পাতা পড়ে যাওয়া, অত্যন্ত দুর্বল লাগা, অস্পষ্ট কথা ইত্যাদি। চন্দ্রবোড়ার ক্ষেত্রেও একই উপসর্গ। দাঁতের মাড়ি, পুরানো ঘা বা কাশির সাথে রক্ত বের হওয়া চন্দ্রবোড়ার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ উপসর্গ। কালাচের বা কালচিতির ক্ষেত্রে ব্যথা বা ফোলা কিছুই হয় না, এমনকি কামড়ের দাগও বোঝা যায় না। আর কালাচ সাধারণত রাত্রিবেলা কামড়ায়। তাই ভোররাতে পেট ব্যথা, গলা ব্যথা, খিঁচুনি ও আব ঘিটতে না পারার কারণ হতে পারে কাল চিতির কামড়। রাতে মেঝেতে ঘুমানো বা মশারিবিহীন বিছানায় ঘুমানো নিশ্চিত করে যে ওটা কালাচেরই কামড়। এরা বিছানায় থাকতে বেশি পছন্দ করে। যার কারণে এখনও বিজ্ঞানীরাও এই সাপকে নিয়ে বিভিন্ন দ্বিধা-দ্বন্ধে রয়েছেন। বিষধর সাপ কামড়ালে ১০০ মিনিটের মধ্যে যে কোনও ব্লক প্রাথমিক হাসপাতালে গিয়ে এভিএস নিলে বাঁচার সম্ভাবনা অনেক অনেক বেশি থাকে। সাধারণত গ্রামাঞ্চলে মাঠে-ঘাটে বিভিন্ন গবাদি পশু বাঁধা থাকে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গরু। তাই গরুও বিভিন্ন সময় বিষধর সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়। কোনও গরুকে সাপে কাটলে তাকে তৎক্ষণাৎ গ্রামীণ প্রাণীমিত্রর কাছে গিয়ে এভিএস-এর আবেদন করতে পারেন। তিনি ব্লক প্রাণী চিকিৎসককে গিয়ে বললে ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে এভিএস -এর ব্যবস্থা করে দেবে। পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত ব্লক পশু চিকিৎসা কেন্দ্রেই এই ব্যবস্থা করা হয়। মানুষের মত গরুকেও বিষধর সাপ কামড়ালে তার একমাত্র চিকিৎসা এভিএস। গ্ৰাম বাংলার ব্লক ও মহকুমা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে এভিএস পাওয়া যায়। এভিএস থাকলেও কেউটে, গোখুরো, কালাচের ক্ষেত্রে এভিএস এর পরেও রোগীর আইসিইউ বা ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন হতে পারে।
আর চন্দ্রবোড়ার ক্ষেত্রে এভিএস দেওয়ার পরও রোগীর ডায়ালিসিসের প্রয়োজন হতে পারে। ভেন্টিলেশন আইসিইউ বা ডায়ালিসিসের কোনও ব্যবস্থাই আমাদের মহকুমা ও ব্লক হাসপাতালে নেই। যার ফলে একজন রোগীর প্রাণের ঝুঁকি সত্ত্বেও তাকে শহরের কোনও বড় হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। যদি মহকুমার প্রত্যেকটি হাসপাতালে ভেন্টিলেশন, ডায়ালিসিসের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় তাহলে গ্রামের কোনও মানুষকেই প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে শহরে যেতে হবে না। এই উদ্যোগ প্রশাসনের আধিকারিক অথবা স্থানীয় প্রতিনিধিদেরই নিতে হবে। আরও বেশি বেশি করে সর্প সচেতনতা শিবিরের আয়োজন করতে হবে যাতে মানুষ নিজের প্রাণের গুরুত্বটুকু বুঝতে পারে। তবেই আমরা গ্রাম বাংলার অসহায় মানুষদের সাপের কামড় থেকে বাঁচাতে পারবো। তাই এই প্রচার আরও জোরদার হোক এই আশা রাখি। সাপের কামড়ে ভয় নাই, সকল চিকিৎসা মহকুমা হাসপাতালেই চাই, এই দাবি আরও জোরদার হোক তবেই গ্রামাঞ্চলের মানুষকে আরও বেশি বেশি করে বাঁচানো অথবা সুস্থ করা সম্ভব হবে।

ঘাটাল মহকুমার সমস্ত আপডেট তে যুক্ত হন আমাদের সাথে!

‘স্থানীয় সংবাদ’ •ঘাটাল •পশ্চিম মেদিনীপুর-৭২১২১২ •ইমেল: [email protected] •হোয়াটসঅ্যাপ: 9933998177/9732738015/9932953367/9647180572/9434243732 আমাদের এই নিউজ পোর্টালটি ছাড়াও ‘স্থানীয় সংবাদ’ নামে একটি সংবাদপত্র, MyGhatalমোবাইল অ্যাপ এবং https://www.youtube.com/SthaniyaSambad ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে।