‘জীবন ও কর্মে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাচ্চা বামপন্থী’:তুহিন বেরা

অতনুকুমার মাহিন্দার, স্থানীয় সংবাদ, ঘাটাল: ‘ধর শালাকে, মার শালাকে, এ দাদা পালিয়ে আয় মা বকবে’, এই আপ্ত বাক্যটির সঙ্গে ঘাটালবাসীর বাহ্যিক চরিত্রের অদ্ভুত মিল আছে। তাই সত্তরের দশকে শহরের কুঠি বাজারের জনসভায় প্রবীণ স্বাধীনতা সংগ্রামী ও কংগ্রেস নেতা প্রয়াত অতুল্য ঘোষ আক্ষেপ করে [‘স্থানীয় সংবাদ’-এর সমস্ত কিছু জানতে এখানে ক্লিক করুন] বলেছিলেন, ঘাটালে মানুষ নেই। অর্থাৎ প্রকৃত প্রতিবাদী মানুষের বড্ড অভাব এখানে। চা দোকানের আড্ডায় বা ভাসাপোলের জটলায় এদের যত বিপ্লব। এই হিসেবী ব্যবসায়িক স্বার্থপরতার পোশাকি নাম ‘শান্তিপ্রিয়”। অর্থাৎ ঘাটালের মানুষ শান্তি চায়। এরা সাতেও নেই পাঁচেও নেই।
এহেন শহরের উর্বর শান্তিপ্রিয় জমিতে, কঠিন এক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার উচ্চ শিখরে উঠে এসেছেন ঘাটাল পুরসভার বর্তমান চেয়ারম্যান তুহিন কান্তি বেরা। শিল্পীর তুলি হাতে এক তরুণের ক্রমে সিপিএম পার্টির হোল টাইমার, সিপিএমের লোকাল কমিটির সম্পাদক, সিপিএম প্রতীকে নির্বাচিত হয়ে কাউন্সিলর পরে তৃণমূলে। আর এখন শহরের প্রথম নাগরিক। এই উত্তরণকে তিনি ভাগ্য মানতে নারাজ। বরং এটা জনগণের কৃতিত্ব বলতে তিনি অধিক স্বস্তিবোধ করেন। চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাস পরে পৌরসভার রুদ্ধদ্বার কক্ষে একান্তে মিলিত হয়েছিল এই প্রতিবেদক। চেহারায় কমিউনিস্ট সুলভ কাঠিন্য পরিত্যাগ করতে বেশি সময় লাগেনি তুহিনবাবুর। সাক্ষাৎকারে একে একে পেঁয়াজের খোসা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন তিনি। দেখব বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে পৌরপিতা তুহিন কান্তি বেরা ঠিক কী কী বললেন।
•শিল্পী থেকে চেয়ারম্যান, ভাগ্য নাকি লড়াই?
—ভাগ্য নয়, মানুষের ভালোবাসা। বিশেষত তিন নম্বর ওয়ার্ডের মানুষের কুড়ি বছরের আস্থা ও বিশ্বাস যা আমাকে আত্মবিশ্বাসী করেছে, এখানে এনেছে।
•বাম থেকে দক্ষিণে, ওটাই কি টার্নিং পয়েন্ট?
—২০১৬ সালে সিপিআইএম ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছি। কিন্তু আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছি বলে মনে করি না। কাউন্সিলর হয়েও কোনও কাজ করতে পারছিলাম না। যাঁরা বলে বেড়ান আমি ক্ষমতালোভী, সুবিধাবাদী, সুযোগসন্ধানী তাঁরা ভুল বলেন। কারণ তৃণমূলে যোগ দিয়ে আমার পরিবার পরিজনদের কোনও চাকরি হয়নি। চারচাকা গাড়ি, বাড়ি, জমি হয়েছে কী? হয়নি। ব্যাঙ্কে একটি সেভিংস অ্যাকাউন্ট আছে। পাস বই দেখতে চাইলে দেখিয়ে দেব। ব্যাস!
•সিপিএমের হোল টাইমার এখন তৃণমূলে, কেমন লাগছে?
—না, সিপিআইএম ত্যাগ করতে আমার কোন কষ্ট হয়নি। কারণ তৃণমূলের মধ্যেও আমি পার্টির থিওরির ক্লাস করা বামপন্থার প্র্যাকটিক্যাল রূপের স্বাদ পেয়েছি। আর আমি বিশ্বাসের সঙ্গে বলতে চাই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জীবন এবং কর্মে একজন সাচ্চা বামপন্থী। তিনি দরিদ্র অসহায়, খেটে খাওয়া কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্তের পাশে থাকেন। সরকারি পরিষেবাগুলি জনগণের বাড়িতে পৌঁছে দেন। যা পৃথিবীর কোনও কমিউনিস্ট দল বা দেশ পারেনি। চ্যালেঞ্জ নিয়ে বলছি।
•চেয়ারম্যানের পদ, জটিল অঙ্ক, না লবি?
—না, কোন কলকাঠি আমি নাড়িনি। লবিও করিনি। নিজেকে দাবিদার বলতেও নারাজ। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আশীর্বাদ করেছেন। তিনি চেয়েছেন বলেই শতাব্দী প্রাচীন ঘাটাল পৌরসভার এই চেয়ার আমি পেয়েছি। আমি ধন্য। আমি কৃতজ্ঞ। এর বেশি উচ্চাশা আমার নেই।
•মেদিনীপুরের প্রশাসনিক সভায় মুখ্যমন্ত্রীর মুখোমুখি হয়ে কেমন লেগেছে?
—ভাবিনি আমি বলার সুযোগ পাব। হোমওয়ার্ক তেমন ছিল না। মুখ্যমন্ত্রীকে কি রাস্তা, জল, আলো চাইবো? তা তো সবই আছে। তাই এমন একটি সমস্যা নিয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি যা তিনি শুনেছেন এবং তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নিয়েছেন, এটা সকলেই টিভিতে দেখেছেন। তিন নম্বর ওয়ার্ডের মানুষের দীর্ঘদিনের ন্যায্য দাবি ছিল এটা। আমি আনন্দিত। মানুষও খুব খুশি।
•ঘাটালের উন্নয়ন, সৌন্দর্যায়ন নিয়ে কী ভাবছেন?
—স্বপ্ন অনেক আছে। হাতে পাঁচ বছর। তাড়াহুড়োতে আমি বিশ্বাসী নই। রাস্তা, আলো, জল পর্যাপ্ত আছে। প্লাস্টিক বন্ধ এবং নির্মল বাংলার কাজ নিয়মিত চলছে। ১৭টি ওয়ার্ডে আলাদা আলাদা কিছু সমস্যা আছে। সেগুলি আমরা বোর্ডে আলোচনা করছি। দশটি মিনি জেনারেটর পেয়েছি। বন্যার সময় কাজে লাগাবো। তিনটি পাম্প পাওয়া গেছে। আরও দুটি পাম্প পাব। একটি পাম্প কুঠিপুকুরে বসাতে চাই। জেলা শাসকের সহযোগিতায় টাউন হল সংস্কার হবে। দ্বিতল করার পরিকল্পনা আছে। আরও অনেক কিছু হবে। আগে থেকে বলতে চাই না। আমি কাজ ভালোবাসি আর এখানে কাজের সুযোগ অনেক আছে। বাকিটা বুঝে নাও।
•বন্যা, বিদ্যুৎ, জলের সমস্যা নিয়ে কী ভাবছেন?
—ঘাটালের বন্যা চিরন্তন সত্য। হাইটেনশন বিদ্যুতের তার, এলাকার ট্রান্সফরমারগুলি উঁচুতে তোলা হচ্ছে। ইলেকট্রিক আর পানীয় জলের যাতে কোনও অসুবিধা না হয় সেটা দেখতে হবে। দশটি মিনি জেনারেটর কাজে লাগিয়ে পাবলিক সাবমার্সিবলগুলি চালু রেখে জল সরবরাহ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
•কয়েক জনের চাকরি, বৃহত্তর ক্ষেত্রে পরিষেবা কোনটাকে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার?
—আমি চাকরির বিরোধী নই। বেকার যুবকের চাকরি প্রয়োজন। কিন্তু একটি গ্রামের এক দুজনের চাকরির চেয়েও দু’হাজার মানুষের সরকারি পরিষেবাগুলি পাওয়া অনেক বেশি কার্যকরী। লক্ষ্মী ভান্ডারের টাকা মার্কেটে আসে। বাজার পুষ্ট হয়। সন্দেহ আছে?
•বিরোধীহীন বিরোধিতা?
—আমি যত ভালো কাজই করি না কেন, বিরোধীরা কোনওদিনই সেটা দেখতে পাবে না। ভগবান ওদের ওই ভাবেই তৈরি করেছেন। তাই অন্ধ সমালোচনা ওরা করবেই।
•অশোক সাঁতরা কি রাজনৈতিক গুরু?
—সততার সঙ্গে বলতে চাই অশোক সাঁতরা আমার রাজনৈতিক গুরু। সিপিএম ত্যাগ করবার সময়ে উনি আমাকে অনেক বুঝিয়েছিলেন। কিন্তু সময় বলে দিচ্ছে, সেদিন আমার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। পৌরসভার মানুষ কাজ করবার সুযোগ আমাকে দিয়েছেন। আজ সিপিএম শূন্য।
•শঙ্কর দোলইয়ের বিষয়ে প্রশ্ন, ক্ষমতাই কী সব?
—শংকর দোলই ব্লকের সিনিয়র লিডার। ওনার সম্বন্ধে আমার বিশেষ কিছু জানা নেই। ইদানিং দেখাও হয় না।
•কংগ্রেস নেতা জগন্নাথ গোস্বামীর ভবিষ্যৎ কী?
—বিপক্ষ দলের হলেও জগন্নাথ গোস্বামীর রাজনৈতিক বিজ্ঞতা দৃষ্টান্ত স্বরূপ। আজও বহু মানুষের মনে তার জায়গা আছে। গ্রাসরুটে থাকি বলেই বলছি।
•এক সময়ের প্রতিপক্ষ অজিত দে বর্তমানে সহযোদ্ধা, কী বলবেন?
—তিন নম্বর ওয়ার্ডের অলোক দের বাড়িতে তৃণমূলের কার্যালয় ছিল। আমি তখন কাউন্সিলর। অজিতবাবু তখন তৃণমূলের নেতৃত্বে। আজ আমরা একসঙ্গে কাজ করছি। তিনি প্রবীণ নেতা। গাইড করেন। কোনও সমস্যা নেই।
•তৃণমূল নেতা অরুণ মণ্ডলের প্রতি কি সত্যিই কৃতজ্ঞ?
—আমি দীর্ঘদিন সিপিএমের হোল টাইমার ছিলাম। সংগঠনের নাড়ি নক্ষত্র জানি। সেই চোখ দিয়ে বলতে পারি, অরুণ মণ্ডল উচ্চ শিক্ষিত না হলেও একজন দক্ষ সংগঠক। ওর হাতেই পার্টি সংঘবদ্ধ আছে। আমার ব্যক্তিগত মত।
•পুরসভার টেন্ডার নিয়ে চর্চা চলছে, কী বলবেন?
—আমি আপনাকে বলতে পারি, টেন্ডার ছাড়া কোনও কাজ হয়নি। তিন নম্বর ওয়ার্ডের ঢালাই রাস্তাও টেন্ডার করেই হয়েছে, সাঁতরাবাবুরা মিটিং মিছিলে আমার সমালোচনা করলেও,তিনি আমার শুভাকাঙ্ক্ষী। এটাই সত্য।
•ঘাটালের রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী?
—ঘাটাল দক্ষিণপন্থী মানুষের শহর। বামেরা সামান্য কিছু সময় কৌশল করে ক্ষমতা দখল করলেও আগামী দিনগুলি তৃণমূলের। কারণ বিগত বোর্ডে বিভাষবাবুর হাতে ঘাটালের প্রভূত উন্নয়ন হয়েছে। মানুষকে আর রাতে টর্চ ব্যবহার করতে হয় না। অলি-গলি, পুকুরপাড় সব ঢালাই। পায়ে আর কাদা লাগে না।
•বিজেপি নিয়ে কী বলবেন?
—বিজেপির হিন্দুত্ব, আমাদের মা- ঠাকুমার হিন্দুত্ব নয়। শীতলা, কালী, দুর্গা মাতার হিন্দুত্ব নয়। রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, বামাক্ষ্যাপার হিন্দুত্বও নয়। এটা উগ্র, অসহিষ্ণু, ভেদ বুদ্ধির রাজনৈতিক কারখানায় তৈরি ক্ষমতালোভীদের হিন্দুত্ব। যা, একদিন ওদের ধ্বংস করবে। কেন্দ্র সরকার মানুষকে ধনে-প্রাণে মেরে ফেলছে। মানুষের জন্য কোনও কাজ ওদের নেই। যেন তেন প্রকারেণ ক্ষমতা দখল। হৈ-হৈ করে দুদিন মানুষকে ভুল বোঝানো যায়। চিরকাল নয়। এক্ষুনি ভোট হলে ঘাটালে পঞ্চাশ হাজার ভোটে ওরা হারবে। সন্দেহ আছে?
•ঘাটাল শান্তিপ্রিয় শহর, কোনও বার্তা?
—সবাই জানে ঘাটাল শান্তির শহর। এখানে রাজনৈতিক সংঘর্ষ হয় না। সকলেই একসঙ্গে থাকি। আমি চেষ্টা করছি তাদের উন্নত পরিষেবা দেওয়ার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায় মাস্টারপ্ল্যানের কাজ শুরু হবেই। বিশ্বাস রাখুন। পাশে থাকুন। আপনাদের পাশে ঘাটাল পৌরসভা অতন্দ্র প্রহরীর মত থাকবে।

ঘাটাল মহকুমার সমস্ত আপডেট তে যুক্ত হন আমাদের সাথে!

‘স্থানীয় সংবাদ’ •ঘাটাল •পশ্চিম মেদিনীপুর-৭২১২১২ •ইমেল: [email protected] •হোয়াটসঅ্যাপ: 9933998177/9732738015/9932953367/9647180572/9434243732 আমাদের এই নিউজ পোর্টালটি ছাড়াও ‘স্থানীয় সংবাদ’ নামে একটি সংবাদপত্র, MyGhatalমোবাইল অ্যাপ এবং https://www.youtube.com/SthaniyaSambad ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে।